Ad Code

অসমাপ্ত অনুভূতি পর্ব - ১৫

 লেখিকাঃ সাবিহা জান্নাত

পর্বঃ ১৫ ( অন্তিম পর্ব )
" ১ম অংশ "
গাড়ি ছুটে চলছে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তায়। জানালার পাশে বসে জানালায় উঁকি দিয়ে দেখছে শ্রুতি। বিষন্ন মেঘের মতো ঘন মেঘ জমেছে তার মনে।
বিভোর আপন মনে গাড়ি ড্রাইভিং করছে। আজ তাদের গ্রাম থেকে বাসায় ফিরে যাওয়ার দিন। সপরিবারে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের আপন নীড়ে।
তবুও দু মানব মানবীর নীড়ে ফেরার আনন্দ মনে বইছে। শ্রুতি এবং বিভোর ভিন্ন ভিন্ন গাড়িতে অবস্থান করেছে।
বিভোর শ্রুতিকে খুব করে তার সাথে নিতে পারতো, জোড় করতে পারতো তার সাথে কিন্তু সব জায়গায় মেয়েটার চেঁচানোর স্বভাব যায়নি। মানুষের মাঝে সিনক্রিয়েট করতে চায়নি বিভোর।
তাদের মধ্যকার ঝামেলা সে বাহিরে প্রকাশ করতে চায় না।চায়না তাদের মাঝে আরো দূরত্ব সৃষ্টি হোক। সবার মাঝে সে নিরব হয়ে সবটা সহ্য করেছে।
কয়েক ঘন্টার জার্নি শেষে বাসায় পৌঁছে যায় তারা। একে একে গাড়ি থেকে নেমে নিজ নিজ জিনিসপত্র নিয়ে নিজেদের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
শ্রুতি গাড়ি থেকে নেমে নিজ বাসার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কতদিন হলো তার নিজে গৃহে প্রবেশ হয়নি। কথা হয়নি জননীর সাথে। চোখাচোখি হতেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে জন্মদাত্রী।
অসহায়ের মতো তাকিয়ে একটিবার মায়ের সাথে কথা বলার অপেক্ষা করে সে কিন্তু জননী বড্ড কঠোর হয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছে মেয়েকে।
অন্য পরিবারের উপর ঘৃনা, রাগ সবকিছুর প্রভাব ফেলছে শ্রুতির উপর । শ্রুতি ভাবনা থেকে বেরিয়ে নিজ রুমের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এতোটা রাস্তা জার্নি করে এসে বড্ড ক্লান্ত লাগছে বিভোরের । সে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। পাশেই শ্রুতি জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে রাখছে। শ্রুতির সাথে সে কথা বলার অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা।
শ্রুতি জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে রাখা শেষে বিছানায় তাকাতেই দেখে বিভোর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। ঘুমন্ত বিভোর আর জাগ্রত বিভোরের মধ্যে কতই না পার্থক্য।
আবরনে কখনো মানুষ চেনা যায় না। মানুষ তার চেহারায় আচরণ যতটা না প্রকাশ তার গভীরে আসল রুপটা লুকিয়ে রাখে। মানুষকে আপনার ক্ষণিকের জন্য ভালো লাগতে পারে ।
তার চাকচিক্য লাবণ্যময় চেহারা দেখে তার মায়ায় জড়াতে পারেন কিন্তু যখন তার লুকিয়ে রাখা আসল রুপটা দেখবেন তখন সব চাকচিক্য লাবণ্যময় চেহারার প্রতি এক ঘৃনা সৃষ্টি হবে , যা তার সমস্ত চাকচিক্য ময়তাকে ধুলিসাৎ করে ফেলবে।
শ্রুতি বিভোরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে ওয়াশ রুমে চলে যায়। বাসায় ফিরে এসেছে অনেক্ষণ যাবৎ কিন্তু এখনো ফ্রেশ হওয়া হয়নি তার।
সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে তবেই সে ফ্রেশ হতে যায়। ফ্রেশ হয়ে একটা হালকা রঙের শাড়ি পড়ে বেরিয়ে আসে সে। লম্বা চুলগুলো শুকিয়ে খোঁপা গেঁথে রাখে।
হঠাৎ ই তার ফোন রিং হতেই সে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে। এতো ব্যস্ততার মাঝে নিজের ফোন টা চেক করতেই সে ভুলে গিয়েছিল। ফোন স্ক্রিনে আম্মু নামটা চকচক করছে।
শ্রুতির মুখে কিঞ্চিত হাঁসির রেখা। না তার আম্মুর ফোন কল নয়, আম্মুর ফোন থেকে দেওয়া ছোট ভাইয়ের ফোন কল। আম্মুর সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকলেও রোজ করে তার ছোট ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রয়েছে।
এ পৃথিবীতে বাবার পরে তার ছোট ভাইটিই তাকে আগলে রেখেছিল আদর স্নেহে। সে কল উঠিয়ে কিছু সময় মন খুলে কথা বলে তার সাথে। তার সমস্ত মন খারাপ গুলো উড়ে যায় শুন্যে।
শ্রুতি ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা রেখে দেয়। বিভোরের থেকে অনেক দিন আগেই ফোনটা সে নিয়ে নিয়েছিল।
শ্রুতির নিজেকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। দুচোখে নিদ্রা চলে এসেছে। শ্রুতি গিয়ে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়ে।
সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙ্গে শ্রুতির। ঘুম থেকে জেগে পাশে বিভোর কে দেখতে পায় না সে। ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখে অনেক বেজে গেছে। জানালার পর্দা সরিয়ে বাহিরে উঁকি দিয়ে দেখে সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যাওয়ার জন্য উদ্ধুত হয়। নিচে গিয়ে দিদুন এবং সায়নীর সাথে সময় কাটায় কিছুক্ষণ। সন্ধ্যার পর রাত আসে , বিভোরের ও দেখা মিলে।
বাহিরে থেকে বাসায় ফিরে এসেছে সে সবেমাত্র। বিভোর চলে যাওয়ার পর পেছনে পেছনে শ্রুতি কফি নিয়ে তার রুমের দিকে হাটা দেয়। এটা রোজকারের ঘটনা সন্ধ্যায় সে বাসায় ফিরবে এবং তার জন্য এক কাপ কফি বরাদ্দ করা।
শ্রুতি বিভোর কে খুব কড়া কথা শোনালেও সব সময় তার সাথে রাগারাগী করার সাহস নেই। ছেলেটা সব সময় রাগারাগি,চিল্লাচিল্লি করবে না তবে মস্তিষ্কে র-ক্ত চড়ে গেলে কারো সাধ্য নেই তাকে শান্ত করার।
শ্রুতি রুমে গিয়ে কফিটা টেবিলে রেখে দেয়। পেছনে থেকে বিভোরের ডাক পেয়েও সে থামে না।চলে যাওয়ার জন্য উদ্ধুত হতেই বিভোর শ্রুতি হাত আঁকড়ে ধরে। শ্রুতির হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে তাকে।
~ শ্রুতি তুমি ভুল বুঝছো আমাকে। আমার আর ইরার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। সেদিন তুমি শুধু ওই ঘটনাটি ই দেখেছিলে পরের চিত্র টা না দেখেই চলে গিয়েছে।
আমাকে মিথ্যা বলে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল আর ইরা ইচ্ছাকৃত ভাবে সবটা করেছিল যা দেখে তুমি......
বিভোর বাকী কথা শেষ না করতেই শ্রুতি বিভোরের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠে,,,,
~ সেটা আপনাদের পার্সোনাল বিষয় ,আপনাদের মাঝে কি সম্পর্ক আছে না আছে আমি জানতে চাই না। শুধু একটা কথাই জানি আপনার মতো মানুষের সঙ্গে আর থাকা সম্ভব নয়।
~ তুমি ছোট্ট একটা ভুল বুঝে আমাদের সম্পর্ক টা নষ্ট করে ফেলছো....( বিভোর )
সম্পর্ক নষ্ট করছি..! সম্পর্ক টা ছিল কোথায় ? না আমি কোনো ভুল দেখেছি আর না ভুল বুঝেছি। আপনি কি ভেবেছিলেন যে আমাকে বিয়ে করে ঘরে রেখে দিবেন আর বাহিরে অন্যদের সঙ্গে যা খুশি আর তাই করবেন।
এতে কেউ কিছুই বলবে না।আপনি তো আমাকে বন্দি করে রেখেছেন আর ভাবছেন এই সম্পর্কটি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবো না । যেভাবে হোক আমি এখানেই থেকে যাবো।সেই জন্য বাহিরের মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন। আর আমাকে বিয়ে করেছেন ব্যবহার করার জন্য....
শ্রুতির কথায় বিভোরের মাথায় র-ক্ত উঠে যায়। চোখগুলো রক্তিম বর্ন ধারন করছে ইতিমধ্যে।শ্রুতিকে নিজের সাথে জোরে চেপে ধরে..
~ বাজে কথা বলবে না একদম। তোমাকে ব্যবহার করার জন্য বিয়ে করেছি আমি। তোমার অতিরিক্ত জেদ সবকিছু আমি মেনে নিয়েছি তার মানে এই না যা খুশি তাই করবে আর সব মেনে নিবো।
ওর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ভুল বুঝছো আমাকে তুমি, আর জেদের বসে সত্যি টা জানার ও চেষ্টা করছো না ।
~ আপনার মনে হয় আমি আপনাকে ভুল বুঝেছি । এতো কিছু করার পর ও বলছেন আপনি কিছুই করেন নি তাহলে এগুলো কি ....?
বলেই শ্রুতি তার ব্যাগ থেকে বিভোর আর শ্রুতির কিছু ছবি বের করে দেখায়।যেখানে ইরা এবং বিভোরের কাপল ছবি ছিল। যা সে তার ব্যাগে ব্যাগে পেয়েছিল জানি না কে রেখেছিল সেগুলো।
~ শ্রুতি এই ছবিগুলো অনেক আগের তোলা হয়েছিল।আর এই ছবিটা গুলোর ভিত্তিতে যা খুশি তাই ভাবতে পারো না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো ।
বিভোরের কথা শুনে শ্রুতি তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠে,,,
~ বিশ্বাস আর আপনাকে। আপনাকে অনেক করেছিলাম বিশ্বাস কিন্তু সেই বিশ্বাস টা অনেক আগেই ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। নতুন করে আবার ও জীবনে ফিরে এসে আবারও আমাকে ঠকালেন।মনটা নিয়ে যেভাবে খুশি সেভাবে খেললেন আর কিছু বাকী রেখেছেন করার...
~ শ্রুতি....
আমি আর আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না । প্রয়োজন নেই আপনার সহানুভূতির । আপনি আমাকে আমার মতে করে থাকতে দিন।
আমি আপনার সাথে আর থাকতে চাই না। এই বিয়ে নামক মিথ্যে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাই আমি। মুক্তি চাই আমি আপনার থেকে।
শ্রুতির কথা শুনে বিভোর তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে রাগী দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। রাগান্বিত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠে,,,
~ কি চাইছো টা কি তুমি হ্যা। বিয়েটাকে ছেলে খেলা মনে হয় তোমার।যখন খুশি ভেঙ্গে দিবে।
~ হ্যাঁ।আমি আপনার সাথে থাকতে চাই না। আমি চাই না আমাদের কখনো কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠক। আমি এই সম্পর্ক টার সমাপ্তি ঘটাতে চাই। ডিভোর্সের প্রয়োজন আমার ...!!
শ্রুতির মুখে কথাটা শোনামাত্রই বিভোর থমকে যায়। নির্বাক হয়ে যায় মুহুর্তের মধ্যে। কখনো ভাবতে পারেনি শ্রুতি তার কাছে এমন একটা কিছু চাইবে।
বিভোরের রক্তিম বর্ন ধারন করা চোখের কোণে পানি জমে গেছে। সে যে কখনো চাই না শ্রুতিকে হারাতে। সত্যি টা সে তাকে বলতেও পারছে না। একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে আরেকটা সম্পর্ক সে ভাঙতে পারবে না।
বিভোর শ্রুতির হাতের বাঁধন আলগা করে দেয়। নির্বাক হয়ে শ্রুতির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে শ্রুতিকে ছেঁড়ে দেয়।
~ বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে। বিভোরের কথায় শ্রুতি কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া করে না । বরং সে নির্বাক হয়ে বিভোরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রাগে তার চোখ লাল হয়ে গেছে।
~ Get out from here ! বিভোরের স- শব্দে বলা কথায় শ্রুতি কেঁপে উঠে।
একটু বেশি বলে ফেলিনি তো। শ্রুতি গুটিগুটি পায়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়‌। দরজা পার হয়ে যেতেই কোনো কিছু ভাঙ্গার শব্দে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখেই থমকে যায় সে।
ড্রেসিংয়ের গ্লাস ভেঙ্গে চুরমার। বিভোরের হাত র-ক্তা-ক্ত হয়ে গেছে, তার হাত থেকে র-ক্ত ঝড়ছে। শ্রুতি বিভোরের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত শাড়ির আঁচল দিয়ে চেপে ধরে।
~ আমার হাত ছাড়ো। বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে বলেই বিভোর শ্রুতির থেকে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করছে। বিভোরের কথা শ্রুতি কানে নেয় না।
সে বিচলিত হয়ে এদিক সেদিক ছুটছে। আজ তার জন্যই বিভোরের এমন অবস্থা হয়েছে। ফার্স্ট এইড বক্স খুঁজে নিয়ে আসে সে। বিভোর কে কোনো কথা বলতে না দিয়ে তাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
বিভোরের হাত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেয় সে। তার চোখের কোণে পানি জমে গেছে। চেহারায় চিন্তার ছাপ বিভোরের জন্য।বিভোরের এমন রাগের সহিত সে আগেও পরিচিত ছিল যেদিন তার উপর রাগ করে সে গ্লাস ভেঙ্গেছিল।
বিভোর শ্রুতির সাথে এই সময় আর একটা কথাও বলছে না। ডিভোর্সের কথা শুনে বিভোরের মাথায় র-ক্ত উঠে গেছে। বিভোর বিছানা ছেড়ে উঠে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই শ্রুতি বিভোরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিভোর কে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে সে।তার বুকে মাথা রেখে সশব্দে কেঁদে চলছে। সে রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। বিভোর সব রাগ অভিমান ভুলে শ্রুতিকে এক হাত দিয়ে বাহুডোরে আগলে নেয়।
শ্রুতির কান্নার ফলে বিভোরের বুকের কাছের শার্টের অংশটা ভিজে একাকার।বিভোর শ্রুতিকে বুকের মাঝ থেকে ছাড়িয়ে নি চোখের পানি গুলো আলতো হাতে মুছে দেয়।
শ্রুতির অবাধ্য চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয় আলতোভাবে। কপালে চুপু একে দেয় তার অপরুপার। নিমিষেই শ্রুতির প্রতি তার সমস্ত রাগ অভিমান অভিযোগ ভুলে বুকের সাথে আগলে নেয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিভোরের মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যায়। শ্রুতি মুরগির ছানার মতো গুটিসুটি হয়ে বুকের মাঝে মিশে রয়েছে। কাল থেকে মেয়েটি একটি কথাও বলেনি।
নাহ্ রাগে নয় ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেছে সে। চোখ মুখ চুপসে গেছে তার। চেহারায় মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। তা দেখে বিভোরের মুখে কিঞ্চিত হাঁসির রেখা। প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার আনন্দ।
পুরোপুরি হয়তো বা তাকে কাছে এখনো পায়নি তবে তার মাঝে এক আশার আলো ফুটে উঠেছে। সেকি সব সত্যি টা বলে দিবে তাকে নাকি তার জন্য আরো বড় বিপদ ঘনিয়ে আসছে।
বিভোর শ্রুতিকে বিছনায় রেখে উঠে ফ্রেশ হতে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে শ্রুতি গাঁয়ে চাদর মুড়িয়ে বিছানায় গুটি মেরে বসে রয়েছে।
এর মাঝে অনেক বার শ্রুতি এবং বিভোরের চোখাচোখি হতেই শ্রুতি চোখ ফিরিয়ে নেয়। সকালের নাস্তা সেরে বিভোর অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। শ্রুতি ঘরে বসে বোর হয়ে যাচ্ছে একদম।
সিফান কে অনেকক্ষণ আগে ফোন করে বলেছে সে আসতে কিন্তু তার আসার কোনো খোঁজ নেই। শ্রুতি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোন স্ক্রোল করছে।
✨
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে সবেমাত্র। বীথি চোধুরী নিজের রুম ছেড়ে ডাইনিং রুমে এসেছেন সবেমাত্র। দরজা সিফান দাঁড়িয়ে রয়েছে, ভেতরে প্রবেশ করতে ইতস্তত বোধ করছে সে। বিথী চৌধুরী সিফানকে দেখেই হাসিমুখে বলে উঠে,,,
~ ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছো যে, ভেতরে আসো।
~ সিফান বাসার ভিতরে গিয়ে বড় আম্মুর সাথে কথা বলে বিভোরের রুমের দিকে পা বাড়ায়। সিফান শ্রুতির কাছে যায়।শ্রুতি সিফানের সাথে কথা বলে নিচে চলে যায়। শ্রুতি সিফানকে হালকা পাতলা নাস্তা দিয়ে আবারও রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় ।
~ আপু আমি তোমাকে দেখার জন্য এসেছি, আমার জন্য কিছু করতে হবে না, তুমি একটু বসো তো।
~ বেশি কথা বলবি না । চুপচাপ বসে থাক, আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি - বলেই শ্রুতি সিফান কে রেখে চলে যায়। সিফান শ্রুতির জন্য যে চকলেট নিয়ে এসেছিল সেটা তাকে দেওয়াই হলো না। তার আপু তাকে দেওয়ার সুযোগ ই দেয় নি। সিফান বিছানায় চুপচাপ বসে রয়।
একটু সময় নিয়ে শ্রুতি সিফানের পছন্দ সই রান্না গুলো করে। নাহ্ সে একা করেনি কাজের মেয়ে তাকে হেল্প করেছে। এটা শ্রুতির নিত্যদিনের ঘটনা।ভাইয়ের আসার কথা কানে আসলে সে মরিয়া হয়ে যায়।কি খাওয়াবে না খাওয়াবে কত কিছুর তার আয়োজন। অথচ বাসায় যখন তখন রোজ নিয়ম করে ঝগড়া হতো। এখন নিয়ম করে ঝগড়া হয় না তবে নিয়ম করে চাতক পাখির মতো বোন অপেক্ষা করে ছোট ভাইয়ের।
শ্রুতি প্লেটে খাবার নিয়ে রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। রুমের ভিতরে গিয়ে দেখে সিফান শুয়ে আছে। খাবার বিছানায় রেখে সিফানের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,,,,
~ আয়। উঠে বস আমি খাইয়ে দেই। না খেয়ে না খেয়ে একদম রোগা হয়ে গেছিস।
~ আপু আমি মোটেও রোগা হয়নি বরং তোমার চোখের পাওয়ার কমে গেছে।
~ অনেক কথা হয়েছে ,এখন চুপচাপ হা কর। সিফান বোনের কথা মতো চুপচাপ খেয়ে নেয়। মায়ের পরে একমাত্র বড় বোন ই হয়তো খুব যত্ন করে ভাইয়ের। ২য় মা হয়ে আসে সে। সিফান নিজ বাসায়ও বোনের আদর পেয়েছে, এভাবে তাকে শাসন করে খাইয়ে দিয়েছে তবে এই আদর টা একটু বেশিই ভালো লাগছে তার।বিয়ের পর বোনের পরিবর্তন মেয়ে থেকে বউ হওয়া সবটাই হয়তো পরিবর্তন হয়েছে তবে বোনের ভালোবাসার পরিবর্তন হয়নি। বরং নিজ বাসায় যতটা না আদর করতো এখন তার থেকে বেশি আদর পাচ্ছে সে।
রোজকার দিনের ভালোবাসা একটু একটু করে জমিয়ে রেখে দিয়েছে তার জন্য। সে রোজ চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে কখন ভাইয়ের দেখা পাবে, সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিবে। শ্রুতি সিফান কে যত্ন করে খাইয়ে দেয়। ভাইয়ের খুশিতেই তার তৃপ্তি। শ্রুতি সিফান কে রেস্ট নিতে বলে সে প্লেটটা পরিস্কার করে রেখ দেয়।
~ একটু রেস্ট নে , একটু পরে তোর পছন্দের পিঠা নিয়ে আসছি। ঠিকমতো নিজের শরীরের যত্ন নিস না তাই না, কত বলি নিজের খেয়াল রাখতে । কথাগুলো শ্রুতি বলছে আর শুকনো কাপড়গুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখছে ।
সিফান অবাক দৃষ্টিতে তার বোন কে দেখছে, কত পরিবর্তন, বাড়ির গিন্নিদের মতো আচরণ। তার নিয়ম করে খাওয়া হয়েছে ঠিকই তবে সেই খাবার তৃপ্তি করে খায়নি। তার বোন চলে আসার পর সবকিছুই ধোঁয়াসা মনে হয়েছিল। কোনো কিছুর অভাব ফিল হতো তার। সব সময়ের যত্ন করার জন্য বোনটার অভাব ফিল হতো।
সিফান শ্রুতির পছন্দের চকলেট গুলো তাকে দিয়ে দেয়। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে বিভোর ও অফিস থেকে ফিরেছে মাত্রই। সিফানকে দেখে তার সাথে ভাব জমাতে শুরু করে দিয়েছে। বয়সের পার্থক্য অনেক হলেও তাদের সম্পর্ক টা বন্ধু তুল্য। অনেকক্ষন যাবৎ সময় কাটানোর পর সিফান বোনের থেকে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
~ আম্মু একটু আমার রুমে আসো তো , তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে।
রাতের খাবার খেয়ে বিভোর রুমে ফেরার সময় তার আম্মুকে বলে যায় কথাটা। বিভোরের আম্মুও খাবার খেয়ে ছেলের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। শ্রুতি কাজের মেয়ের সাথে মিলে খাবার গুলো সেলফে গুছিয়ে রাখছে।
সবকাজ শেষ করে শ্রুতি নিজের রুমে যাওয়ার জন্য উদ্ধুত হয়। সে রুমের কাছাকাছি যাওয়ার পর রুমের ভেতরে থেকে বিভোরের রাগান্বিত স্বর শুনতে পায়। সে তার মাকে কিছু একটার জন্য দোষী সাব্যস্ত করছে। শ্রুতি একটু আগ্রহ নিয়ে দরজায় কান পেতে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করছে যদিও তা উচিত না তবুও সে শোনার চেষ্টা করে।বিভোর কেন তার মায়ের সাথে রাগারাগী করে মূলত সেই কারনেই তার এমন করা ।
~ আম্মু ব্যস অনেক হয়েছে আর ইনোসেন্ট সাজার চেষ্টা করো না। তিন বছর আগে আমাকে শ্রুতির থেকে আলাদা করার কাজ টা যদি তুমি করে থাকো তাহলে ইরা আর আমার ছবিগুলো শ্রুতি কে তুমি দাও নি তার কি গ্যারান্টি আছে।তুমি শ্রুতিকে আমার সম্পর্কে ভুল বোঝানোর জন্য এসব করেছো, শ্রুতিকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এসব পরিকল্পনা তোমার ছাড়া আর কারো হতেই পারে না।
বিভোরের কথা শুনে তার বিচলিত কন্ঠে বলে উঠে,,,
~ কি যা তা সব বলছো ।আমি শ্রুতিকে কেন তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো। আমি এসব কিছুই করিনি আর আমি তোমাদেরকে বিয়েতে মেনে নিয়েছিলাম সেদিন ই ।আমার কোনো আপত্তি নেই শ্রুতিকে মেনে নিতে।
~ তাহলে এই ছবিগুলো কে দিয়েছে শ্রুতিকে। আনসার মী ? বিভোরের শেষের ধমকের সহিত কথাটা শুনে তার আম্মু চমকে উঠে। শ্রুতি তাদের কথাটা শুনে থমকে যায়। বিভোরের আম্মু তাদের কে আলাদা করে দিয়েছিল তিন বছর আগে।
~ আমি জানি না কে পাঠিয়েছে। তুমি খামোখা আমাকে সন্দেহ করছো ( বিথী চৌধুরী )
~ কয়েক বছর আগে তোমার জন্য আমি শ্রুতিকে হারিয়েছিলাম , আমি আর ওকে হারাতে চাই না ( বিভোর )
তিনবছর আগের ঘটনা
🍁TikTok
শ্রুতির বাবা মারা যাওয়ার
পর স্বপরিবারে ভেঙ্গে পড়ে। বিশেষ করে শ্রুতি যে কিনা তার বাবাকে না দেখে এক মূহূর্ত থাকতে পারতো না আজ তাকে ছাড়া সারাটা জীবন কাটাতে হবে। এই সময়টায় মাত্র পরিবারের কিছু মানুষ তাদের সহানুভূতি দেখিয়েছিল কিন্তু শ্রুতির বিভোর কে খুব করে প্রয়োজন ছিল তার। কিন্তু সে পায়নি তাকে কাছে। সেও অন্যদের মতো দূর করে দিয়েছিল।
তার মূল কারন ছিল বিভোরের আম্মু। অনেক কষ্টে তিনি দুচোখের কাটা দূর করেছিলেন। যাকে দুচোখে দেখতে পেতেন না সেই মেয়েটিই তার ছেলের বউ হতে চেয়েছিল। এটা শোনার পর তিনি তা কখনোই মানতে রাজি হননি। তাই তো তিনি নিজের মৃত্যুর হুমকি দিয়ে ছেলের থেকে দূরে সরিয়ে দেন মেয়েটিকে। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করে তেমনই শ্রুতি এবং বিভোর সামনাসামনি থাকলে বিভোর অবাধ্য হয়ে ছুটে যেত শ্রুতির কাছে।এটা ভেবেই বিভোরের আম্মু ছেলেকে নিজ শহর থেকে দূরের কোনো এক শহরে পাঠিয়ে দেন। সবাই সবকিছু পেয়ে গেল কিন্তু একমাত্র অসহায়ের মতো ছোট্ট মেয়েটি বাঁচতে শিখলো।
বর্তমান
🍁
তোমার বিষয়ে এই কথাগুলো যদি শ্রুতি কখনো জানতে পারে তাহলে তোমার সাথে কখনোই তার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠতো না।আমি নিজেকে দোষী করে রেখেছি শ্রুতির কাছে তবুও আমি চাইনি তোমাদের সম্পর্ক টা খারাপ হোক।তোমার খুশির জন্য নিজের খুশিকে বিসর্জন দিয়েছিলাম আমি। ওমন দুঃসময়ে মেয়েটাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলাম। অথচ সেই সময়টায় শ্রুতির আমাকে খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমি কি করলাম ওর জন্য ওকেই কষ্ট দিয়ে চলে গেলাম।
বিভোরের কথাগুলো শুনে শ্রুতি কিছু মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। তাহলে এখানে বিভোরের কোনো দোষ নেই। সবটাই তার আম্মুর প্ররোচনায় এসব হয়েছে। বিভোরের পরিবর্তন শ্রুতিকে খুব অবাক করেছিল কারন এই মানুষটি কখনো তাকে ছেড়ে যেতে পারত না। যদি তাদের বিচ্ছেদ হতো তাহলে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হতো। মনের মধ্যে নানা প্রশ্নের জবাব আজ শ্রুতি পেয়ে গেছে। শ্রুতি সেখানে আর দেরী না করে কড়িডোরের অন্যপাশে চলে যায়। তার শাশুড়িমা তাকে দেখে নিলে ভাববে আমি লুকিয়ে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করছি।
কিছু সময় পর বিভোরের আম্মু রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার কিছু সময় পর শ্রুতি রুমে চলে যায়। সে যে সবটা জানতে পেরেছে সেটা সে প্রকাশ করেনা বিভোরের কাছে।সে আর চায় না তাদের মাঝে কোনো মনমালিন্য হোক। ফিরে পাওয়া মানুষ টাকে আর সে হারাতে চায় না। সবাইকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় না।
এভাবেই অনেক দিন কেটে গেল তাদের মাঝের সম্পর্ক টাও ভালো হতে শুরু করলো। শুধু তার মায়ের সাথেই কিছুটা মনমালিন্য থেকে গেল। তার আম্মু তার উপর আর রেগে নেই তবে কিছুটা অভিমান জমে আছে মেয়ের উপর। শ্রুতিও আম্মুর অভিমান ভাঙানোর সর্বচেষ্টা করছে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে এই আশায় সে স্বপ্ন দেখছে।
🍁
শীতের রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে শ্রুতি তার প্রিয় মানুষের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। বিভোর ঘুমাচ্ছে অঘোরে কিন্তু শ্রুতি নিদ্রাহীন। শুয়ে শুয়ে সে বিভোরকে রাত বিরাতে জ্বালিয়ে মারছে। শ্রুতি মুখটা মলিন করে মৃদু সুরে বিভোরের মুখের কাছে মুখটা নিয়ে বলে উঠে,,,
~ এই যে শুনছেন, এই শুনন না। শ্রুতির কয়েকবার ডাকে বিভোর জাগ্রত হয় তবে সে এখনো অর্ধঘুমে। চোখ বন্ধ করে ঘুমঘুম চোখে বলে উঠে,,,
~ হুম বলো। বলেই শ্রুতি কে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয় বিভোর।
~ আমার না খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে ।নিয়ে আসুন না আমি আইস্ক্রিম খাবো।
বিভোর শ্রুতির কথায় ঘুমঘুম চোখে বলে উঠে__
~ মাঝরাতে আইসক্রিম কই থেকে নিয়ে আসবো। কাল খাওয়াবো নি, আজ ঘুমাও অনেক রাত হয়েছে।
~ নাহ্ আমার এখনি খেতে ইচ্ছে করছে ,আমাকে এখনই নিয়ে এসে দিন আইসক্রিম যেখানে থেকে পারেন।
শ্রুতির কথায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিভোর রাজি হয়ে যায়।সে কম্বলের মধ্যে থেকে বের হয়ে শীতের জ্যাকেট পড়ে দেয়। এই মাঝরাতে আইসক্রিম কই যে পাবো এই মেয়েটার শুধু মাঝরাতেই সব কিছু খেতে ইচ্ছে করে।
~ আমিও যাবো আপনার সাথে , আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমিও তৈরি...
~না , মাঝরাতে তোমার যেতে হবে না আমি নিয়ে আসছি , তুমি ঘরে অপেক্ষা করো। শ্রুতির কথায় বিভোর না করে সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দূরে একটা জায়গায় একজন রুটি বিক্রেতা রুটি ভেজে তা বিক্রি করছে। পাশেই একটা আইসক্রিমওয়ালা ভ্যানে করে আইস্ক্রিম বিক্রি করছে।বিভোর ফোন স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে ১২টা পার হয়েছে। জীবিকার তাগিদে মাঝরাতে মানুষ গুলো নিদ্রাহীন। জীবন যেখানে যেমন।
বিভোর কিছু সময় রুটির দোকানে বসে সেখানের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আইস্ক্রিম নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পৃথিবীতে কত বিচিত্র মানুষ রয়েছে। মানুষ তার পরিবারের জন্য কি না করছে, পৃথিবীতে যত আয়োজন একটা সুষ্ঠু সুন্দর পরিবারের জন্য। এই কষ্ট করা মানুষ গুলো ভালো থাকুক সব সময় যারা পরিবারের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে রয়েছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিভোর বাসায় পৌঁছে যায়। বিভোর শ্রুতিকে আইসক্রিম হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবারও বিছানায় শুয়ে পড়ে।
এরপরে দিন যায়, মাস যায় , বছর পেরিয়ে যায়। শ্রুতি মা হতে চলেছে, পরিবারে খুশির জোয়ার নেমে আসে। দুই পরিবারের ঝামেলা মিটতে শুরু করে। মা মেয়েকে বুকে আগলে নেয় সযত্নে।
একদিন রাতে শ্রুতি বিভোরের বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। কতশত রাত সে নিদ্রাহীন কাটিয়ে দিচ্ছে, সে শুধু একা না বিভোরও তার সব সময়ের সঙ্গী।বিভোর শ্রুতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আলতোভাবে।
~ শুনুন না আমার না খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে ।শ্রুতির কথায় বিভোর শ্রুতির কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলতে শুরু করে ___
~ পাখি আমার এই সময়টায় আইসক্রিম খাওয়া যাবে না তোমার
ডাক্তার নিষেধ করেছে, শুনেছো তো ।শ্রুতি অনেক বার জেদ করা সত্ত্বেও বিভোর রাজি হয় না। রাত বিরাতে এমন জেদ করো কেন বললাম তো খাওয়া যাবে না, ঘুমাও তুমি। শ্রুতি বিভোরের রাগি হয়ে বলা কথায় মন খারাপ করে অন্য পাশ হয়ে শুয়ে পড়ে।
মাঝরাতে কারো ক্রমাগত কান্নার আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই বিভোর জেগে যায়। ল্যাম্পের আলোটা জ্বালিয়ে দিতেই দেখে শ্রুতির পাশে নেই। কান্না টা বিছানার নিচে ফ্লোর থেকে আসছে। বিভোর বিছানা থেকে নেমে আসতেই দেখে শ্রুতি ফ্লোরে বসে খাটের সাথে হেলান দিয়ে কান্না করছে।বিভোর শ্রুতিকে বুকের সাথে আগলে নেয় সে কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না শ্রুতির কান্নার আওয়াজ থামছেই না। মাঝরাতে শ্রুতির পেটে পেইন শুরু হতেই তার কান্নার আওয়াজ বেড়েই চলেছে। দুই হাত দিয়ে বিভোরকে আঁকড়ে ধরেছে সে। চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়ছে তার। বিভোর বাসার সবাই কে ডেকে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। মাঝরাতেই শ্রুতিকে হসপিটালের নিয়ে গিয়ে তাকে এডমিট করিয়ে দেওয়া হয়‌।
পর্বঃ ১৫ ( অন্তিম পর্ব )
"শেষাংশ "
শ্রুতিকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে‌।আর কিছু সময় পর তার সিজারের কার্যক্রম শুরু হবে। শ্রুতিকে টেস্ট রুমে নিয়ে যাওয়া হয়,সবার মুখে চিন্তার ছাপ, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ডাক্তারের জবাবের জন্য।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে কথাটা জানাতেই সবার মুখ চুপসে যায়। ডাক্তারের বলা কথাটা হলো এই যে হয়তো মাকে বাঁচাতে হবে নয়তো বাচ্চাকে।
কথাটা শোনার পর থেকেই সবার মুখে মলিনতার ছাপ। ডাক্তার তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য তাড়া দিতেই বিভোর বলে উঠে__
~ আমার স্ত্রী কে বাঁচিয়ে রাখুন। বলেই একটা ফর্মে সে সাক্ষর করে দেয়। জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত তার কাছে এটা মনে হচ্ছে।মনে মনে কত শত স্বপ্ন বুনিয়ে রেখেছে সে, তার মেয়ের সাথে কাটাবে কিন্তু স্বপ্ন গুলো আজ ধোঁয়াশাই মিলিয়ে গেল।
শ্রুতিকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সবাই বাহিরে অপেক্ষারত। প্রায় আধঘন্টা পর নার্স একটা ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চাকে তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে নিয়ে এসে বিভোরের হাতে তুলে দেয়।
বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে বিভোরের মুখে হাসির রেখা কিন্তু পরক্ষনেই তার শ্রুতির কথা মনে পড়তেই বিচলিত কন্ঠে বলে উঠে,,,
~ বাচ্চাটা সুস্থ তাহলে আমার স্ত্রী, তার কিছু হয়নি তো । বিভোরের কথায় ডাক্তার বিভোরের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠে,,,
~ মিঃ চৌধুরী আপনি বিচলিত হবেন না। আল্লাহর রহমতে আপনার স্ত্রী এবং বাচ্চা দুজনেই ঠিক আছে। আপনার স্ত্রীর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। আপনার স্ত্রী কে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।
কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার জ্ঞান ফিরে আসবে। ডাক্তারের কথায় বিভোর কিছুটা স্বস্তি পায় তবুও নিজ চোখে তার স্ত্রী কে দেখে আসে। শ্রুতিকে দেখে সকলে ই মনে স্বস্তি ফিরে পায়।
🍁
পাঁচ বছর পর ,,,
ড্রয়িংরুমে দৌড়াতে দৌড়াতে বাচ্চা মেয়েটি পড়ে যেতেই "পাপা" বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। বাচ্চা মেয়ের চিৎকার শুনেই বাচ্চা মেয়েটির বাবা মা দাদু দিদুন সকলেই তড়িঘড়ি করে উঠানোর জন্য এগিয়ে আসে।
~ মামুনি তোমার ব্যাথা লাগে নি তো। বিভোর বিচলিত কন্ঠে নিজের মেয়ে বিভা কে বলে উঠে,,,
~ আমার কোথাও লাগেনি তো পাপা । আমার সুইট পাপা থাকতে আমার কিছুই হবে না - মুখে একরাশ হাসি নিয়ে পাপার উদ্দেশ্যে বলে উঠে কথাটা বিভা।
~ আমার সোনা মামুনি কথা টা বলেই বিভোর বিভার কপালে চুমু এঁকে দেয়। বিভোর বিভা কে দাদুমনির কাছে রেখে রুমে চলে যায়।
~মাই সুইটহার্ট কি করছো - বিভোর শ্রুতির কাঁধে মাথা রেখে কথা টা বলে। শ্রুতি বিভোরের দিকে ঘুরে খাবারের বাটি টা দেখিয়ে মুখে হাঁসি নিয়ে বলে উঠে,,
~ আপনার মেয়ের জন্য খাবার তৈরি করেছি সেগুলো খাবে না বলেই দৌড়াদৌড়ি করছিল। যার ফলশ্রুতিতে সে পড়ে গিয়ে আম্মু না ডেকে পাপা বলে উঠে।
জানেন তো আমি খুব কম মানুষকে দেখেছি যে ব্যাথা পাওয়ার পর আম্মুকে না ডেকে পাপা কে ডাকে।
~দেখতে হবে তো মেয়েটা কার বলেই বিভোর শ্রুতিকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নেয়।
~হ্যা অনেক হয়েছে। আপনি বসুন আমি আপনার জন্য কফি নিয়ে আসছি । শ্রুতি বিভোরের জন্য কফি নিয়ে আসতে নিচে চলে যায়। শ্রুতি বিভোরের জন্য কফি নিয়ে বের বিভোরের কাছে চলে যায়।
তাদের দুষ্ট মিষ্টি সম্পর্ক খুনসুটিতে ভরপুর। মেয়েটার বয়স পাঁচ বছর। তাকে নিয়েই তাদের জীবন খুশিতে ভরপুর। বিভা কে পেয়ে বিভোর ২য় মা পেয়েছে। অবুঝ বাচ্চাটা তার ছোট ছোট হাত দিয়ে হাসিমুখে সবকিছু তাঁর বাবার মুখে তুলে দিবে।
রাতে শ্রুতি বিভা কে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। মেয়েটা হবার পর তার জীবনে যেমন খুশির জোয়ার নেমে এসেছে তেমনি মেয়েটার সব যন্ত্রণা তাকেই সহ্য করতে হয়। কত শত রাত নিদ্রাহীন হয়ে থাকতে হয় তাকে তার হিসাব নেই।
শ্রুতি বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে বাহিরের সৌন্দর্য দেখছে , ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে বাহিরে, বেলকোনির গ্রীলের হাত রেখে সে পানি ছোঁয়ার চেষ্টা করছে।
~ পাখি আমার বলেই হঠাৎ ই বিভোর ইভোর শ্রুতিকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে। শ্রুতি বিভোরের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই বিভোর শ্রুতিকে বাহুডোরে আগলে নেয়।
বিয়ের এতো বছর পরও তাদের মাঝে কখনো কোনো মনমালিন্য দেখা দেয়নি আর। বিভোর আগের মতোই শ্রুতি আগলে রেখেছে।
~ অনেক রাত হয়েছে ঘুমাবে চলো বলেই বিভোর শ্রুতিকে পাঁজর কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ল্যাম্পের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে শ্রুতিকে বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। শ্রুতি বিভোরের বুকে মাথা নুইয়ে ফেলে।
[ সমাপ্ত ]



Post a Comment

0 Comments

Close Menu