লেখিকাঃ  তানজিল মীম

“তুমি কি আজ একবার আমার ভার্সিটি আসতে পারবে তিশা?”

উদাসীন কণ্ঠ, গলায় দৃঢ়তার স্পর্শ আর মুখে হতাশার ছাপ নিয়ে কথাটা বলে উঠল আদি। আদির কণ্ঠ শুনে খানিকটা বিচলিত কণ্ঠ নিয়ে বললো তিশা,
“আমাকে কি যেতেই হবে? না গেলে হয় না।”
“তুমি কি কোনো প্রবলেমে আছো?”
“না বিষয়টা তেমন নয়। আমার কাছে এখন ভার্সিটি যাওয়ার মতো টাকা নেই। যা টাকা ছিল সব বন্ধুদের সাথে বসে খেয়ে দেয়ে শেষ করে ফেলেছি।'
তিশার কথায় হাসে আদি। বলে,
“আমি গাড়ি পাঠাবো তুমি কি আসবে?”
উত্তরে তিশা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“ঠিক আছে পাঠান।”
খুশি হলো আদি। বললো,
“ঠিক আছে আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি তুমি এসো।”
“আচ্ছা।”
বলতেই আদি ফোন কাটলো। ভার্সিটির একজন টিচার আদি। আর যার সাথে কথা বললো সে ওর উডবি বউ তিশা। বিয়ে হয় নি কিছুদিন পর হবে।
প্রায় দু'সপ্তাহ আগে তিশাকে দেখতে এসে পছন্দ করে আদি আর আদির পরিবার। তিশা পছন্দ করেছে কি না কেউ জিজ্ঞেস করে নি ছেলে পক্ষ রাজি ব্যস বিয়ে পাক্কা। একটা সময় পর ফ্যামিলির সবাই নিজেদের সিদ্ধান্তটা চাপিয়ে দেয় তার মেয়ের ওপর। মেয়ে মুখ বুঝে মানলে ভালো না মানলে মার থাপ্পড় কথা শোনানো। তিশাও প্রথম অপশনটাই মেনে নিয়েছে কারন সে তার বাবার মুখের ওপর কথা বলতে পারে না। তবে আজ যদি একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতো তাহলে হয়তো কিছু বললেও বলতে পারতো। আদি দিনে কম করে হলেও রোজ পাঁচবার কল দিবে কথা বেশি বলে না তাও কল দিয়ে জাস্ট তিশার ভয়েসটুকু শোনে। বিষয়টা তিশা ঠিক কি নজরে নেয় বোঝা যায় না। কারন সে থাকে পুতুলের মতো চুপচাপ আদি বলে সে শুধু শোনে আর হ্যা বা না'য়ের মাঝে উত্তর দেয়। দুই সপ্তাহে তিশা তিনবার গেছে ভার্সিটি আদির সাথে দেখা করতে তিনবারই আদি ডেকেছে আর সে নিজ খরচে গিয়েছে কিন্তু আজ তার কাছে টাকা নেই। তিশা যে খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে এমনটা নয় মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে বাবার ছোট্ট একটা দোকান আছে। ছেলের বাবা একজন ব্যাংকার। তিশার বাবার কাছে প্রায় সই কিছু না কিছু কিনতে দোকানে আসে আর তখনই একদিন হুট করে দেখে তিশাকে। আর তখনই পছন্দ করে বসেন। ছেলের পক্ষের নিজস্ব বাড়ি আছে কিন্তু তিশাদের নেই। বলতে গেলে পাত্রপক্ষের চেয়ে পাত্রীরা একটু নিম্নমান শ্রেণির। তবে এসবে নাকি পাত্রপক্ষের কোনো আপত্তি নেই।'
তিশা পড়াশোনায় খুব ভালো, আবার একেবারেই ভালো না এমনটা বলা যাবে না সে মোটামুটি লেভেলের। পড়লে পারে কিন্তু পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্স হয় নি বিধায় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। অবশ্য এতে তার বা তার পরিবারের কিছু যায় আসে না। কোনোদিন ছিলও না। কিছু কিছু ফ্যামিলি থাকে যাদের ইচ্ছেই থাকে তাদের ছেলেমেয়ে জেলা বিশেষের ইউনিভার্সিটিতে পড়বে। কিন্তু তিশার পরিবারে তেমন কিছু নেই চ্যান্স পেলে পেল না পেলে নাই এমন।'
কলেজের ক্যান্টিনে বন্ধুদের সাথে হাসি ঠাট্টা করছিল তিশা। এমন সময় তার ফোনটা বাজলো। তিশা বুঝেছে আদির গাড়ি এসে পড়েছে। তিশার হাসি মলিন হলো, সে খুব নিশ্চুপতার স্বরে বললো,
“আমাকে যেতে হবে কাল দেখা হবে।”
বান্ধবীরাও বিদায় দিল কারন তারা জানে তিশা এখন কোথায় যাবে!'
তিশা হাঁটছে মনটা বড় বিষণ্ন সে বুঝতে পারছে না বিয়েটায় সে খুশি নাকি অখুশি। তবে সে এখনই বিয়ে করতে চায় নি। কেবলই অর্নাস ফাস্ট ইয়ারে পড়ছে এখনও কতকিছু বাকি ছিল তার,
' বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করা বাকি,
' সবাই মিলে কলেজ ট্যুরে যাওয়া বাকি
' পিকনিক করা বাকি
' বান্ধবীদের বিয়ে খাওয়া বাকি
' বন্ধুদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা বাকি
' বছর চারেক বাদে রেগ ডে করা বাকি আরও কত কি?'
মাঝখান দিয়ে বিয়ে। তিশা জানে না বিয়ের পর তার শশুর বাড়ির লোকেরা তাকে পড়াশোনা করতে দিবে কি না। বা দিলেও উপরের জিনিসগুলো করতে দিবে কি না। জোরে নিঃশ্বাস ফেললো তিশা।'
তিশা হেঁটে গেল আর তার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল আশিক। তাদের ক্লাসমেট ছেলেটা ক্লাস শুরু থেকেই তিশাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু কখনো সাহস করে বলে নি, আর হয়তো বলাও হবে না। আশিক খুব স্বল্প স্বরে বললো,
“ভালো থেকো না বলা ভালোবাসা! কিছু অনুভূতি না হয় একান্তই আমার নিজের মাঝেই থাকুক। শুধু শুধু খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়া এই হৃদয়টা একান্ত পুড়ুক!'
তিশা ভার্সিটি থেকে বের হতেই গাড়ির ড্রাইভার একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে আসলো। বললো,
“ম্যাডাম ভালো আছেন?”
লোকটার কথা শুনে বেশ লজ্জা ফিল করলো তিশা। বললো,
“আমাকে ম্যাডাম বলার দরকার নেই আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট নানাভাই আমার নাম ধরে ডাকবেন।”
লোকটা মুগ্ধ হলো। বললো,
“ঠিক আছে।”
“জি চলুন যাই তাহলে।”
বলেই গাড়ি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো তিশা। জীবনে এই প্রথম হয়তো সে প্রাইভেট কারে বসছে। বিষয়টাকে হুট করে সোনার চামচ মুখে দেওয়ার মতো জিনিস। সেই হিসেবে তিশার খুব খুশি হওয়া উচিত এত বড় বাড়িতে তার বিয়ে হচ্ছে এত বড় সম্মানিত ব্যক্তি একজন ইউনিভার্সিটির টিচার বর পাচ্ছে। তাও তিশা খুশি হতে পারছে না। কারন সে এমনটা চায় নি। সে কি চেয়েছিল তা হয়তো আজীবন তার মাঝেই আটকা থাকবে কেউ জানবে না।'
তিশা চুপচাপ বসে আছে। মোবাইলে দুপুর দুটো বাজে আকাশে মেঘ করেছে, বালি মিশ্রিত বাতাস বইছে হয়তো বৃষ্টি নামবে। কিন্তু ইউনিভার্সিটি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আর বৃষ্টি নামলো না। শুধু কালো মেঘেই ঢাকা ছিল চারপাশ।
তিশা গাড়ি থেকে নামলো। সামনেই বড় বড় অক্ষরে লেখা 'খুলনা ইউনিভার্সিটি'। তিশা ভিতরে ঢুকলো সে জানে আদি কোথায় থাকবে। আদি বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের একজন টিচার। মাথা ভর্তি ট্যালেন্ট। তিশা তো বুুঝে না ওতো ট্যালেন্টের মাঝে তার এই গোবর মাথা ঢুকলো কি করে? তিশার যেখানে দুটো ইংরেজি বলতে ঠোঁট কাপে সেখানে আদি এক মিনিট থরথর করে ইংরেজিতে প্যারাগ্যারাপ বলে দিতে পারবে।'
তিশা এমনটা চায় নি তার জীবন সঙ্গী অত্যাধিক ট্যালেন্টেট হোক, এতে নিজেকে ছোট মনে হয়। সবসময় নিচু ভাব আসে। যদিও সবার চিন্তা ধারা এক নয়। কিন্তু তিশা এমনটা ভাবে, সে চেয়েছিল তারা যেমন মধ্যবিত্ত তার জীবন সঙ্গীও মধ্যবিত্ত হবে কিন্তু, দীর্ঘশ্বাস বের হলো আবার।'
তিশার ভাবনার মাঝেই আদি ডেকে উঠলো তিশাকে। বললো,
“তুমি ওখানেই দাঁড়াও আমি আসছি।”
তিশা দাঁড়িয়ে পড়লো। আদি তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসলো তিশার দিকে বললো,
“চলো। আসতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো?”
তিশা শুঁকনো হেঁসে জবাব দিলো,
“না।”
আদি তিশার চোখের দিকে তাকালো। শীতল সুরে বললো,
“তুমি কি জানো আমি বার বার তোমার চোখে হারাচ্ছি তিশা। আমার বড্ড ভয় হয় তুমি যদি আমায় ছেড়ে চলে যাও।”
তিশা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো আদির দিকে। পরক্ষণেই শান্ত স্বরে বললো,
“এমন কিছু হবে না।”
আদি খুশি হলো। তিশার হাত ধরেই চলে গেল গাড়ির কাছে আশেপাশের সবাই দেখলো তাদের। কিন্তু এতে আদির কোনো চিন্তা নেই। তিশা মাথা নুইয়ে চললো। মনে মনে বললো,
“মানুষটা ভালো, হয়তো সে বিয়ের পর ভালোই থাকবে। সময়ের সাথে সাথে ভালোও বেসে ফেলবে হয়তো। কিন্তু মানুষটা কি কখনো জানবে,'আমি তাকে চাইনি।”
তিশা মনে মনে আশিককে পছন্দ করতো। আশিককে প্রথম যেদিন কলেজে কালো শার্টে দেখেছিল তখনই তার ভালো লেগেছিল। হয়তো আশিকের দিক থেকে তেমন ইঙ্গিত আসলে সে রাজি হয়ে যেত। তিশা আর ভাবলো না। তবে সে এটা জানে না আশিককে কি আধও ভালোবেসেছিল নাকি শুধুমাত্র ভালোলাগা ছিল। তিশা চোখ বুঝে মনে মনে ভাবলো,
“সে সব ভুলে নতুন করে সবটা শুরু করবে। কে বলতে পারে আজকের না চাওয়া পুরুষটি হয়তো আগামী দিনগুলোতে তিশার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পাওয়া হয়ে যাবে।”
তিশা আদি গাড়িতে বসলো ছুটলো দূরে। বৃষ্টি নামতে লাগলো হঠাৎ আদি হাত ধরে বসলো তিশার। তিশাও কিছু বললো না নিশ্চুপ রইলো শুধু!'
সমাপ্ত......
ছোট গল্প
🥀