লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার
গোসল করে পরিপাটি হয়ে খাবারের টেবিলে এসে সুপ্তি লক্ষ্য করে অনিতা অনুপস্থিত। দুপুরে তার বাবা-চাচারা থাকেনা এটা স্বাভাবিক আর আজ তো ভাইয়েরও অফিস তবে অনিতা কোথায় ভেবে জিজ্ঞেস করে " মা!!... অনিতা আপি কি ফিরেনি ভার্সিটি থেকে....."
: চলে গেছে.... সংক্ষিপ্ত উত্তর মিসেস সাবিহার।
: মানে?.... কোথায়?... কার সাথে?.....
: আলভি'র কাছে থাকবে এখন....
: মানে কি বুঝলাম না??....
: সুপ্তি!!.... এসব নিয়ে আর কোন কথা না......
মায়ের এমন কঠিন উত্তরের পর দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করার সাহস হয়না সুপ্তির। অর্ধ নিমিত মস্তকে খাবার শেষ করে চলে যায় নিজের কামরায়। তার কিশোরী মন চঞ্চল হয়ে আছে নানা অজানা প্রশ্নে। সব বুঝেও বর্তমানে চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনেহয় সুপ্তির।
গ্রীষ্মের দুপুরে রোদের প্রখরতা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায়। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার পার্শ্বে ঠায় দাঁড়িয়ে সুপ্তি চারিদিকের জনশূন্য পরিবেশ অবলোকন করছিলো। সে অনুভব করে তার হৃদয়ও এভাবেই পুড়ে যাচ্ছে না বলা কথায়, শূণ্যর কোঠায় ঠেকে যাচ্ছে প্রিয় মানুষ গুলোর সংখ্যা। তার খুব ইচ্ছে করছে কেউ তার সাথে একটু কথা বলুক, একটু খোজ নিক সে কেমন আছে। মনের অস্থিরতা অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পেলে জানালার কাচ ভিড়িয়ে সুপ্তি মন্থর পায়ে এসে থামে আলভি'র দেয়া উপহারের বক্সের সামনে। এখন এই বস্তু গুলোই তার একমাত্র ভালো থাকার সঙ্গি। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে একটি এ্যরোমা ক্যান্ডেল তুলে নেয় যার চিরকুটে লেখা ছিলো,,,,,,,,,,,
" আমার পুস্পবাগে খুব যতনে বড়ই গোপনে বেড়ে ওঠা আবেগের পুস্প তুইই,,,,যার সৌরভ আমাকে প্রতি মুহূর্ত দ্বিগুণ ভাবে মুগ্ধ করে তুলছে,,,,,,,,,,,,,,,"
বরাবরের মতন এবারও সুপ্তি'র মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ পায়। গোলাপি ঠোঁটে মৃদ্যু হাসি খেলে গেলেও আঁখিদ্বয় ছলছল করছিলো।
-----------------------------------
লাঞ্চ টাইমে আলভি তার পিএস থেকে খবর পেয়ে মি.আফতাবের কেবিনের সামনে যেয়ে উপস্থিত হয়। প্যান্টের পকেটে দু'হাত গুজে কেবিনের দরজায় খানিকটা সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয় আলভি। এরপর ইতস্তত ভাবে প্রবেশ করে মি. আফতাবের ডেক্সের সামনের দাঁড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে " চেয়ারম্যান স্যার!!.... আমাকে ডেকেছিলেন??...."
ছেলের এমন সম্বোধনের এক প্রকার হতাশ হয়ে মি. আফতাব বলেন " এ কেমন ডাক!!.... আলভি??.... আমি তোমার বাবা!!.... ভুলে গেছো??"
আলভি ঠোট কামড়ে ডান বামে একটু তাকিয়ে দম নিয়ে পুণরায় শক্ত গলায় বলে " যারা বাবা ডাক শিখিয়েছিলো তারা কেউই বর্তমানে আমার লাইফে নাই!!!!......আন্ড নাউ ইট'স ওয়ার্কিং আওয়ার.... "
: এরকম ইম ম্যাচিউরের মত করছো কেন??....
: ম্যাচিউরড জন্যই অনেক কিছুই এখনো না দেখার ভান করে যাইই.....
: কি বলতে চাও??
: কোম্পানি কেন সেপারেটড হলো??...
: আলভি!!.. এটা.....
: জাস্ট আনসার দিলেই হবে.....
: বিশেষ কিছু না..... ফারহান... আমি... চাইলাম তোমরা নিজেদের মত গুছিয়ে নাও নিজেকে.....
: প্রস্তাব কে রেখেছিলো?...
: প্রস্তাবের কি আছে এখানে?....
: আমি চেক করছি.... সব রেকর্ড -ই দেখবো.....
: এমন কিছু করো না যাতে নিজের ক্ষতি হয়!!.....
: হুয়াট এম আই কলড টু ডু??....
মি. আফতাব বুঝে যান আলভি আর কথা আগাতে চায় না তাই তিনি কিছু ফাইল তাকে দিয়ে বলেন " এগুলা তোমার আন্ডারে থাকবে..... ইনফ্যাক্ট এগুলো তোমারই....আর দ্রুত মিটিং করে নিবে ডিরেক্টরদের সাথে......সামনে ফেস্টিভ্যাল আছে...... "
: ইয়েস স্যার!!..... বলে আলভি চলে যেতে পা বাড়ালে মি. আফতাব ছেলে কে আবার ডেকে বলেন " আলভি!!.... সিলভিয়ান তোমার সাথেই থাকবে.....আমি তোমার শাহীন কাকা কে দিয়ে ওর রুম রেডি করে দিয়েছি...."
মি. আফতাবের এমন সিদ্ধান্তে আলভি প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে একবার তার বাবার দিকে তাকালেও মুখ ফুটে কিছু না বলে বেরিয়ে আসে।
আলভি কেবিনে ফিরে মনমরা হয়ে ফাইল গুলো টেবিলে ছুড়ে চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেয় আরাম কেদারায়। সকাল থেকে কম্পিউটার স্ক্রীনে এক নাগাড়ে কাজ করায় চোখেও ব্যথা হচ্ছে সাথে তার বাবা'র এমন কথাবার্তায় যেন মাথা টাও বেশ ঝিম ধরে যায়। চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নিতে চাইলেও বাইরে সিলভিয়ান আর একটি মেয়ের শোরগোলের শব্দে বিরক্ত হয়ে বেল বাজিয়ে কেবিনে ডাকে সিলভিয়ান কে।
সিলভিয়ানের সাথে মেয়েটিও এক প্রকার জোর করে কেবিনে ঢুকে বেশ কর্কশ স্বরে বলে " কি রে ভাইয়া!!..... এখন তোর কেবিনে আসতে আমারও পারমিশান লাগবে..... আর ভর দুপুরে না খেয়ে কিসের রেস্ট নিচ্ছিস.... আর এই যে মি. সিলভি!!.... স্যার যে লাঞ্চ করেনি সেটা খেয়াল আছে আপনার??...... " অনর্গল কথা গুলো বলে থামে অনিতা।
আলভিও ততক্ষণে খেয়াল করেছে মেয়েটি আর কেউ নয় তার ছোট বোন খাবার নিয়ে চলে এসেছে অফিসে। অনিতার কথা শুনে আলভি এবার সিলভিয়ানের দিকে তাকালে সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বলে " সরি স্যার!!.... আমি আসলে আপনার রেস্ট নেয়া........ "
সিলভি'র কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই আলভি শব্দ করে হেসে বলে " ইটস ওকে!!.... ও আমার বোন অনিতা!!......."
সিলভিয়ান কেমন যেন বোধগম্যহীন দৃষ্টে অনিতার দিকে তাকিয়ে বলে " অনিতা!!.....ছোট বোন!!....."
অনিতা এবার বলে বসে " ভাইয়া!!.....তোর এই পিএস কে দেখতে কার মত লাগে জানিস??!!...."
: কার??....উৎসুক হয়ে জানতে যায় আলভি।
: উম্মম্ম.... তোর মত!!..... হা হা হা.....
অনিতার কথায় আলভিও মৃদ্যু হেসে সিলভি'র দিকে তাকালে সে কিছুটা বিব্রতবোধ করে ফিরে যেতে চাইলে অনিতা বলে " আ...আহা!!.... চলে যাচ্ছেন কেন?...আমাদের সাথে লাঞ্চ করেন!!....আপনার বস এতটাও খাড়ুস না....
: ইটস ওকে ম্যাম!!.....
: ওহহো!!.... আপনি তো এখন আমাদের সাথেই থাকবেন.... লাঞ্চ করতে প্রবলেম কোথায়??....
: তুইও জানিস?!!... কথার মাঝে জানতে চায় আলভি।
: হুম্ম... বাবা বলেছে....
: আসুন মি. সিলভিয়ান..... লাঞ্চ টা করে নিই.....
তারা দু'জন একসাথে টেবিলে বসলে অনিতা খাবার পরিবেশন করে দেয়। বলা হয় মায়ের পরে বোন সেই আদর স্নেহের জায়গা হয়ে যায়, এমুহুর্তে অনিতা কে দেখে আলভি'র সে কথাই বারবার মনে হচ্ছিলো। অনিতা আলভি'র পাশে বসলে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে কয়েক বার মুখে তুলে খাবার খাইয়ে দেয় সে।
---------------------------------------
এক ঘেয়েমির দীর্ঘ দ্বিপ্রহর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সুপ্তি নিচতলার ডাইনিংয়ে বসে তার বড় ভাইয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় অধির আগ্রহে বসে আছে। সুপ্ত'র বাড়ি ফিরতে তেমন একটা দেরি হয় না। গাড়ির হর্ণের শব্দে সুপ্তি আগে থেকে দরজায় দাঁড়িয়েছিল সুপ্ত'র জন্য। সুপ্তি'র দেখা পেতেই হাসি মুখে এগিয়ে এসে সুপ্ত ওর দিকে একটা আইস্ক্রিম দিয়ে বলে " নে আপুনি!!.... শরীর কেমন আছে??....."
: হুম্মম.... ভালোই আছি... তোর কেমন ছিলো অফিস ডেই??...
: হুমহ!!.. ভালো...
: ভাইয়া...কফি নিয়ে আসছি..... তুই ফ্রেশ হয়ে নে....
: বাব্বাহ!!... সুপ্তি!!....ঠিক আছে নিয়ে আয়....
সুপ্তি কিচেনে চলে যেতে সুপ্ত'র চেহারার সেই হাসি ভাব মলিন হয়ে যায়। দোতলায় এসে একমনে আলভি আর অনিতার কামরার দিকে কিছুক্ষন মন খারাপ করে তাকিয়ে থেকে চলে যায় তার রুমে।
সুপ্তি দু' মগ কফি বানিয়ে এনে দেখে সুপ্ত গোসল করে বেরিয়ে আসছে মাত্র। কফির এক মগ এগিয়ে সুপ্তি বলে " খেয়ে নে ভাইয়া.... ঠান্ডা লাগবে না....."
: থ্যাংকস!!....
সুপ্তি সামান্য হেসে চুপচাপ সুপ্ত'র বিছানায় যেয়ে বসে।
সুপ্ত কিছুক্ষণ সুপ্তি কে মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে ওর পাশে বসে এক হাত ধরে বলে " সুপ্তি!!....আপুনি!!... মন খারাপ??!!..... "
সুপ্ত'র কথার কোন জবাব দিতে পারেনা সুপ্তি, ছলছল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়ায়।
সুপ্ত কিছু বলতে যাবে তার আগেই মিসেস সাবিহার ডাক শুনে সুপ্তি চোখ মুছে স্বাভাবিক হয়ে বসে থাকে। ছেলের অফিসের আজকে প্রথম দিন ছিলো কেমন হয়েছে সব কিছু এসব ব্যাপার নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেন সুপ্ত'র সাথে। মায়ের সাথে কথার ফাকেও অতি সতর্কে সুপ্ত'র দৃষ্টি বারবার তার ছোট বোনের দিকে চলে যাচ্ছিলো। মিসেস সাবিহা প্রায় ত্রিশ মিনিটের মত ছেলের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে ফিরে যান নিজের সংসারের কাজে।
সুপ্ত এবার বোন কে তার দিকে ঘুরিয়ে বলে " ভাইয়া আছিনা!!.... কি হয়েছে??... আমাকে বল??!...."
: নাহ!!.... সেরকম কিছুই না.... শুধু আজকের দিন টা অনেক বড় ছিলো আমার জন্য.....
সুপ্ত বেশ গম্ভীর হয়ে সুপ্তির কথা গুলো শোনে। এখন সুপ্ত পরিপূর্ণ যুবক বয়সের, সেও জানে কৈশরে এমন কিছু মুহুর্ত থাকে যখন মনেহয় সবাই তার যত্ন নিক আবার কখনো অযথাই মন খারাপ হয়ে যায় যার নির্দিষ্ট কোন কারণই থাকে না, আর সুপ্তি তো মেয়ে তার মুড সুইং তো আরো বেশি হবে তার যত্নের বেশি প্রয়োজন এখন। এই সময়ই একটা মেয়ে কে গড়ে তোলার সময় কিন্তু সুপ্তি যা কিছু দেখছে কোনটারই ভালো প্রভাব পড়বে না তার ওপর। তাকেই নিজের বোনের খেয়াল রাখতে হবে পরিবারের আর কেউ রাখুক বা না রাখুক।
: ভাইয়া!!.... এই ভাইয়া!!.....
সুপ্ত ঘোর কাটিয়ে বলে " ঘুরতে যাবি??......"
: তাই!!....মা... যেতে দিবে কি??...
: হা... হা.... তোর ভাইয়া এখন বড় হয়ে গেছে.... যা রেডি হয়ে আয়!!.....
: লাভ ইউ ভাইয়া!!.....
: হইছে... হইছে.... যা!!.....
সুপ্তি হাসি মুখে বেরিয়ে যায় বড় ভাইয়ের সাথে ঘুরতে যাবে বলে তৈরি হতে।
সুপ্ত ফোন হাতে বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবে নাড়াচাড়া করতে করতে অবশেষে একটা নাম্বারে ডায়াল করে,,,,,
: হুম্মম্ম.... সুপ্ত!!... বলরে!....
: কোথায় আছিস?...
: বাসাতেই....
: আসছি.... রাতে ওখানেই থাকবো....
: ওহ!!....তো আয়না!!....বলছি....
: হুম্মম... বল?...
WhatsApp:...... ...... ......
: হুম্মমহ!!..... সুপ্তিও আসবে!!.....
0 Comments