লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার
মিনিট ত্রিশ পরেই কনফারেন্স রুমে মিটিং আছে আর এভাবে তাদের প্রধান কোথায় চলে গেলেন ভেবে কর্মচারী সকলে একে অপরের মুখ কৌতহল নিয়ে চাওয়া চায়ি করে।
-------------------
মি. ফারহান দ্রুত তৈরি হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলেন আচমকা সুপ্ত হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে। সকলের দৃষ্টি উপেক্ষা করে অনিতা কে ডাকতে ডাকতে সোজা চলে যায় দোতলায় তার কক্ষে। বিরক্তি নিয়ে মি. ফারহান তার স্ত্রী'র দিকে তাকালে মিসেস সাবিহা ইশারায় জানান তিনি কিছু জানেন না। উপায়ন্তর না দেখে মি. ফারহান হাত ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে ডাইনিংয়ে সোফায় বসে পরেন ছেলের অপেক্ষায়।
সুপ্ত কে এভাবে ছুটে চলে আসতে দেখে অনিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সুপ্ত রুমে ঢোকে কোন কথাই বলতে পারেনা হাটুতে হাত দিয়ে নিচু হয়ে হাফাচ্ছে।
অনিতা এগিয়ে এসে বলে " স... সুপ্ত!!....."
হাতের ইশারায় অনিতা কে থামিয়ে মাথা নিচু করে সুপ্ত এসে দাঁড়ায় খোলা বাতায়নের সামনের। আনমনে কিছুক্ষন বাইরে তাকিয়ে থেকে সে অবস্থায় জিজ্ঞেস করে " চলে যাওয়ার কারণ?!......."
অনিতার দিকে পিছন ফিরে দাড়িয়ে বিধায় সে অনুমান করতে পারছেনা সুপ্ত'র মুখের ভঙ্গিমা তবে কন্ঠস্বরে বেশ বোঝা যাচ্ছে সে গম্ভীর হয়ে আছে। আমতা আমতা করে অনিতা পালটা প্রশ্ন করে " তুইই বল!.... আমার এখানে থাকা টা কি মানায়?...."
সুপ্তও কোন জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে বসে " আলভি'র সাথে কথা হয়েছে?..."
: হুম্মম্ম.....
উত্তর শোনে সুপ্ত এবার অনিতার দিকে ফিরে। ঠোঁটে ঠিকিই হাসি কিন্তু চোখের ভাষা ছিলো বেদনার। মাথা দুলিয়ে বলে " গুড!!.... সিচুয়েশন এমন হয়ে গেছে যে তোদের প্রতি আর দাবী করেতও পারবোনা!!......"
অনিতা এবার সুপ্ত'র দিকে এগিয়ে এসে বলে " এভাবে বলিস না!!..... তুই ভেবে দেখ!!.... আর ভাইয়াও তো একা আছে.... যেখানে আমার ভাই থাকছে না সেখানে আমার থাকাটা........."
: হুম্মম্ম.... সেটাই!!... ইউ নো অনিতা!!.... আমি আসার পর থেকে মোটেও শান্তির সাথে থাকতে পারিনি!..... একের পর এক সবাই কে হারাচ্ছি!!.... আর এখন.... যাহ!!.... চলে যা!....
: একের পর এক সবাই কে হারাচ্ছিস মানে?!!....
: হুমহ!... নীলিমার কথা জানিস?...
: হুম্মম...
: উফ!!... একটুও পারিনি নিজেকে টাইম দিতে.... মাইন্ড ফ্রেশ করতে.... তার আগেই এত সব কিছু......
: দেখ সুপ্ত!!.... তুই ইন্টেলিজেন্ট পারসন!!... সময়ের সাথে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে.... হুম্মম.... আর আমি ভাইয়া কেও চিনি.... সে তোর থেকে দূরের হলো এটা ভাবলি কি করে!!.... এত চিন্তা করিস না.... চল!!.... আজ তোর অফিসের ফাস্ট ডে.... লেট হয়ে যাচ্ছে...... বলে অনিতা ফিরে তার ট্রলির দিকে।
হঠাৎ পিছন থেকে সুপ্ত অনিতার এক হাত টেনে ধরে বলে " আমি খুব একা হয়ে যাবো রে!!..... আসবি তো আবার!!......."
মৃদ্যু হেসে অনিতা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দেয়।
নিচ তলায় এরই মধ্যে সবার উদ্বিগ্ন ভাব বেড়ে গিয়েছে। মিসেস সাবিহা ও রুমানা পায়চারি করছেন আর বারবার অনিতার কক্ষের দিকে তাকিয়ে দেখছেন। কিছু সময় বাদে সুপ্ত অনিতার ট্রলি নিয়ে আর পেছনে অনিতা বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে। তাদের কে এভাবে নিচে আসতে দেখে সকলের জিজ্ঞাসু মনোভাব যেন এক ইঞ্চি বৃদ্ধি পায়।
অনিতা হাসি মুখে এগিয়ে আসে বাড়ির বড়দের দিকে এরপরে মিসেস সাবিহা ও মি. ফারহান কে উদ্দেশ্য করে বলে " আংকেল!... আন্টি!.... আমি ভাইয়ার কাছে যাচ্ছি!....."
মি. ফারহান একবার অনিতার দিকে তাকালেও মুখে কিছুই বললেন না তবে মিসেস সাবিহা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন " ভাইয়ার কাছে যাচ্ছো ভালো কথা কিন্তু তোমার......"
অনিতার ফের মৃদ্যু হেসে বলে " আসলে আন্টি আমি চলে যাচ্ছি...... এখন ভাইয়ার সাথেই থাকবো......"
মিসেস সাবিহা কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন তার পূর্বে মি. ফারহান বলেন " বেড়াতে আসিও আবার..... আর তোমার বাবা'র দিকেও খেয়াল রাখিও!!..... আলভি তো এসবের তোয়াক্কাও করেনা!!...."
মি. ফারহানের এমন কথায় অনিতার মুখ শুকনো হয়ে যায় তারপরও মেকি হেসে বলে " জ্বি আংকেল!!.... চেষ্টা করবো!....."
সবার দিকে অনিতা আরেকবার ফিরে সালাম জানিয়ে সুপ্ত'র থেকে ট্রলি নিয়ে বেরিয়ে যায় কুঞ্জন ভিলা থেকে।
আলভি'র পাঠানো গাড়ি ইতোমধ্যে অপেক্ষমান সুপ্তদের বাড়ির গেটে। অনিতা গাড়িতে উঠে বসে সুপ্তকে আসতে দেখে থেমে যায়। সুপ্ত'র চোখে তখন অসহায়ত্বের দৃষ্টি, অনিতার খারাপ লাগে তাই সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সুপ্ত কিছু সময় চুপচাপ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে অনিতার হাত ধরে ক্ষীণ কন্ঠে বলে " খুব মিস করবো তোদের!!.... খুব!!... আলভি কে নিয়ে আবার আসিস!!......"
অনিতার চোখে পানি চলে আসে আড়ষ্ট গলায় বলে " নিজের খেয়াল রাখিস!!.... বাই!!........"
ক্লেষ্ট হেসে অনিতা কে বিদায় জানিয়ে গাড়ির দরজা লাগিয়ে দেয়। যতক্ষন দৃষ্টিতে আলভি'র গাড়ি দেখা যায় ঠায় দাঁড়িয়েছিল সুপ্ত।
এদিকে,,,, অনিতাও একবার চলন্ত গাড়ি থেকে পিছন ফিরে তাকিয়ে সুপ্ত কে দেখতে পায়। মনের অজান্তে গাল বেয়ে দুফোটা নোনাজল গড়িয়ে পরে। মনে মনে ভাবে জীবন কত অদ্ভুত সময়ের সাথে কত দ্রুত সব বদলে যায়। নিজেদের সব কিছু থাকার পরও এই বাড়িতেই ছোট থেকে বড় হওয়া, সুপ্ত সুপ্তি কে নিজের ভাই বোনের মত ভাবা, মিসেস সাবিহা'র কাছে মায়ের ভালোবাসা পাওয়া অথচ এই মানুষ গুলোকেই কেমন যেন পর অনুভব হচ্ছে। সত্যিই কি মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য এত কিছু করতে পারে? এক বুক স্মৃতি নিয়ে অনিতা পাড়ি জমায় ভাইয়ের কাছে।অনিতার কাছে সবার আগে তার ভাই কারণ ছোট থেকেই সে অনুভব করেছে এই মানুষ টা হাজার মাইল দূরে থাকলেও অনিতার সব কিছুতে ছিলো তার সজাগ দৃষ্টি।
------------------------------------
আলভি তার কেবিনে বসে পুরনো সব ফাইল গুলো মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো এসময় কেউ একজন নক করে শিশার দরজায়।
: মে আই কাম ইন স্যার!!.....
ফাইলে চোখ রেখে আলভি বলে " কাম ইন!...."
: স্যার!!....আ'ম ইউর সেক্রেটারি সিলভিয়ান..... চেয়ারম্যান স্যার অ্যাপয়েন্টেড মি......
: মেনশন নট!!..... এনিওয়ে......প্লিজ সিট হেয়ার..... বলে আলভি ছেলেটির তাকিয়ে চুপ হয়ে যায়।
সিলভিয়ান একটু বিব্রতবোধ করে জিজ্ঞেস করে " এনিথিং রং স্যার?!!....."
: উম্মম?.... নো... একচুয়ালি তোমার চেহারা টা আমার খুব চেনা চেনা লাগছে......
: সরি স্যার??....
: ফরগেট ইট!.... এই সেক্টরের কোন এক্সপেরিয়েন্স আছে?.....
: নো স্যার!!.... আমি আপনার সাথে থেকে শিখতে চাই....
: হুম্মম্মম.... কাউকে তো সুযোগ দিতেই হবে এক্সপেরিয়েন্স এর জন্য....
: রাইট স্যার!!..... সো গ্রেট অফ ইউ!!......
: ওয়েলকাম মি. সিলভিয়ান!!.... ইউ ক্যান কল মি আলভিয়ান অর আলভি..... দ্যাটস ইউর উইশ.....
: থ্যাঙ্কিউ স্যার... আ... আলভি স্যার!!.... হেয়ার ইজ মাই অল ইনফরমেশন....... বলে সিলভিয়ান তার ফাইল এগিয়ে দেয়।
আলভি ফাইল নিয়ে সিলভিয়ানের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রসংশা করে বলে " ইউর মার্কিং পয়েন্ট ইজ ভেরি এক্সিলেন্ট!!..... ফাইল টা আমার কাছে থাকলো......."
: ওকে স্যার!!.....
: লিসেন!.... আমি লাস্ট কয়েক বছর বাইরে ছিলাম স্টাডির জন্য.....তো এখন তোমার কাজ হলো..... আমাকে যত দ্রুত পারো লাস্ট ফাইভ ইয়ারের কোম্পানির প্রফিট এন্ড লসের লিস্ট করে রিপোর্ট জানাও......
: ওকে স্যার!!..... আই উইল ট্রাই টু মাই লেভেল বেস্ট!....
: হুম্মম্ম..... এই ল্যাপটপ কোম্পানির পক্ষ থেকে দেয়া হলো.... এখন থেকে তোমার.... এটাতে সব রিপোর্ট সেভ রাখবে.....
: ইয়েস স্যার!!....
: ইউ মে গো নাউ!!......
: শিউর স্যার!!..... বলে সিলভিয়ান চলে যায় তার ডেস্কে।
আলভি'র কেবিনের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো সিনিয়র স্টাফদের ডেস্ক। তবে সেখান থেকে স্পষ্ট সিলভিয়ানের ডেস্ক দেখা যায় সে কিছুক্ষন চিন্তিত দৃষ্টিতে সিলভিয়ানের দিকে চেয়ে থেকে পুনরায় নিজের কাজে মন দেয়।
সিলভিয়ানের ফোন বেশ কিছুক্ষণ হলো ভাইব্রেট হচ্ছে কিন্তু সে রিসিভ করতে ইতস্তত করছে। এক পর্যায় সতর্ক দৃষ্টিতে আলভি'র রুমের দিকে তাকালে সে লক্ষ্য করে তার বস এখন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। সে সুযোগে চট করে ফোনের সাথে ব্লুটুথ এয়ার বাড'স সংযুক্ত করে কল রিসিভ করে। নিচু গলায় বলে " এতবার কল দিচ্ছো কেন বাবা!!.... আমি অফিসে!!......"
: তোমাকে সন্দেহ করেনি তো!!....
: সেরকম না....
: হুম্মম....তোমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটা মনে রেখো.....
: আচ্ছা... রাখি এখন....
: এত তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে চলবে না... আর এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই..... রাখছি....
: হুম্মম.... রাখো রাখো..... বলে কল কেটে একটু দীর্ঘশ্বাস নেয় সিলভিয়ান।
" সিলভি!!..... "
কারো গুরু গম্ভীর ডাকে সচেতন হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে সিলভিয়ান লক্ষ্য করে চেয়ারম্যান মি. আফতাব স্বয়ং তার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়ে সিলভিয়ান বলে " চেয়ারম্যান স্যার!!.... আপনি?!..."
: এটা তোমার ওয়ার্কিং এরিয়া..... সো বি সিনসিয়ার!!....
মাথা নিচু করে সিলভিয়ান বলে " সরি স্যার!!.... আই উইল ফলো দ্যা রুলস!!...."
: তোমার স্যারকে ইনফর্ম করবে.... সে যেন লাঞ্চ আওয়ারে আমার কেবিনে দেখা করে......." বলে চলে যান মি. আফতাব।
সিলভিয়ানও নিজেকে ধাতস্থ করে কাজে মন দেয়।
--------------------------
সুপ্তি কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে বেলা একটা বেজে যায়। সারাদিন মোটামুটি ভাবে কলেজের সময় পার হলেও নিজের কক্ষে আসতেই পুরনো ক্ষতের মত আলভি'র স্মৃতি তার হৃদয়ে নাড়া দেয়। ঘরে ঢোকার পরপরই বেরিয়ে আসে দীর্ঘ শ্বাস। সুপ্তি অনুভব করে শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তির ভার অনেক বেশি। এলোমেলো ভাবে নিজেকে এলিয়ে দেয় বিছানায়।
খাবারের সময় হয়ে গেলেও সুপ্তি এখনো টেবিলে আসেনি দেখে মিসেস সাবিহা শংকিত মনে সুপ্তির রুমে আসেন। দেখেন মেয়েটি কলেজ ড্রেস পড়ে সেভাবেই বিছানায় শুয়ে রয়েছে। মেয়ের কপাল ছুয়ে বোঝার চেষ্টা করেন অসুস্থ কিনা। মায়ের হাতের ছোঁয়া পেতে সুপ্তি মাকে জড়িয়ে ধরে।
: কি হয়েছে?... শরীর খারাপ লাগছে???......
: না মা... এমনি ভাল লাগছে না.....
এবার মিসেস সাবিহা রাগতস্বরে বলেন " তাহলে এভাবে থাকার কারণ??..... সে কখন এসেছিস কলেজ থেকে.... এত এলোমেলো হলে চলবে??...... যা ফ্রেশ হয়ে আয়..... টেবিলে সবাই অপেক্ষা করছে..... "
মিসেস সাবিহা চলে যেতে সুপ্তি বিড়বিড়িয়ে বলে " ধুর!!..... শুধু শুধু বকা দেয়... সব সময় কি মন একরকম থাকে..... ভালো লাগেনা!!....... "
গোসল করে পরিপাটি হয়ে খাবারের টেবিলে এসে সুপ্তি লক্ষ্য করে অনিতা অনুপস্থিত। দুপুরে তার বাবা-চাচারা থাকেনা এটা স্বাভাবিক আর আজ তো ভাইয়েরও অফিস তবে অনিতা কোথায় ভেবে জিজ্ঞেস করে " মা!!... অনিতা আপি কি ফিরেনি ভার্সিটি থেকে....."
: চলে গেছে.... সংক্ষিপ্ত উত্তর মিসেস সাবিহার।
: মানে?.... কোথায়?... কার সাথে?.....
: আলভি'র কাছে থাকবে এখন....
: মানে কি বুঝলাম না??....
0 Comments