লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার

নিচে দাঁড়িয়ে আলভিও কিছুক্ষণ তার ছোটবেলার সাথী'র দিকে চেয়ে থাকে, চোখের নোনাজলে ভিজে যায় গাল। নতমস্তকে ধীর পায়ে এগিয়ে রাতের নিকশ কালো আধারে মিশে যায়। আলভি অদৃশ্য হতেই সুপ্তি বলে ওঠে " আলভি ভাইয়া!!!!!!.................."

জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় সুপ্তি'র কোমল শরীর খানা।
এত রাতে হঠাৎ কারো চিৎকারের শব্দে সবাই অস্থির হয়ে নিজের কামরা থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়িতে এখনো পুরুষ মানুষরা পৌছায়নি তাহলে কোন বড় ধরনের বিপদ হলো নাতো। এসব ভাবনার মাঝেই তারা লক্ষ্য করে সুপ্ত ওর ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে যাচ্ছে সুপ্তি'র ঘরের দিকে। মিসেস সাবিহা, রুমানা, অনিতা সকলেই সুপ্ত কে দ্রুত অনুসরণ করে সুপ্তি'র কক্ষে যায়। এরই মধ্যে সুপ্ত বারান্দা থেকে সুপ্তিকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বারবার আলভি কে ডাকছে। মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে মিসেস সাবিহা আঁতকে ওঠেন। দৌড়ে গিয়ে সুপ্তি'র মাথা কোলে তুলে নেন, গালে মুখে হাত বুলিয়ে সুপ্তিকে ডাকতে থাকেন। মিসেস রুমানা আর অনিতা হাত পায়ের তালুতে তেল মালিস শুরু করে। সুপ্ত চটজলদি বাথরুম থেকে মগে পানি এনে সবাই কে সরিয়ে সুপ্তি'র চেহারায় পানির ঝাপটা দেয় কিন্তু তবুও সুপ্তি'র জ্ঞান ফিরেনা। সুপ্ত আবারও আলভি'র নাম ধরে ডাকে, আলভি আসছে না দেখে ওর রুমে ছুটে যায়।
সে জানতো না তার আরো অবাক হওয়ার বাকি ছিলো। আলভি'র ঘরে এসে বার কয়েক ডেকেও সারা শব্দ না পেয়ে খোজাখুজি করে নিশ্চিত হয় আলভি রুমে নেই। হঠাৎ এত রাতে সে কোথায় থাকতে পারে ভেবে কল দেয় আলভি'র নাম্বারে। বলা হয় নাম্বার টি এ মুহুর্তে বন্ধ রয়েছে। সুপ্ত মাথায় হাত দিয়ে অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করে সারা ঘরময়। কি হচ্ছে এসব, কোন উত্তর জানা নাই। সুপ্তি'র কথা মনে হতে আবার সেই রুমে যেয়ে সুপ্ত দেখতে পায় এখনো সুপ্তি অজ্ঞান হয়েই রয়েছে। কান্না ভেজা কন্ঠে মিসেস সাবিহা বলেন " ক,,,কিরে আলভি কই!!!"
TikTok
: আ,,,আছে,,,আম্মা!!,,,ব,,, বলছি,,, আমি গাড়ি বের করছি,,,,এভাবে রাখা ঠিক হবে না,,,,,
: যা করবি তাড়াতাড়ি কর,,,,সুপ্তি'র হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে,,,,,,ব্যস্ত কন্ঠে বলে অনিতা
: হ্যাঁ,,, হ্যাঁ,,,, তুই বরং একটু বাবা কে জানা ,,,,ফিরেনি তো এখনো,,,,,বলে সুপ্ত আবার বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
একদিকে আলভি'র এভাবে উধাও হয়ে যাওয়া অন্যদিকে সুপ্তি'র এই অবস্থায় অনেক বিচলিত হয়ে আছে সুপ্ত। হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি বের করতে বলে মতিন কাকা কে গ্যারেজ থেকে।
সুপ্ত আবার বাড়ির ভিতরে ছুটে যায়। সুপ্তিকে কোলে নিয়ে নেমে আসে, আলতো হাতে বসিয়ে দেয় সিটে। অনিতা'র গায়ে ঢলে পরে সুপ্তি, শক্ত হাতে জড়িয়ে নেয় সে। সুপ্ত'কে এভাবে অস্থির হতে দেখে অনিতা ওর এক হাত ধরে বলে ওঠে " সুপ্ত!!...."
: হ্যাঁ!!....
: ত..তুই এত অস্থির হোস না!!... আর ভাইয়া কোথায়?!!...
: জানিনা!!
: ম.. মানে?!!...
: আলভি ওর রুমে নাই!!....
মিসেস সাবিহা গাড়ির দিকে আসছেন দেখে অনিতা চেপে যায় বিষয় টা। মিসেস রুমানাও নিচে নেমে এসেছেন ওদের বিদায় দিতে।
নিশব্দ রাতে হর্ন বাজিয়ে গাড়ি ছুটে চলে হসপিটাল অভিমুখে।
---------------------------
অপরদিকে...
আলভি " কুঞ্জন ভিলা " থেকে বেশ কিছুটা পথ পায়ে হেটে পেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে এক বেঞ্চিতে বসে। প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছে, বুকের ভিতরে ভীষণ অস্থিরতা। রাতের শীতল বাতাস এসে গায়ে লাগছে তবুও ঘেমে একাকার। নিজেকে একটু স্বস্তি দিতে শার্টের দু'টো বোতাম খুলে হাতা ফোল্ড করে নেয়। পরপর বেশ কয়েকবার গভীর দীর্ঘশ্বাস। অসহায় ভঙ্গি নিয়ে তাকায় আকাশের দিকে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। তথাপি ছেলেদের তো কাঁদতে বারণ, বলা হয় দুর্বলতার কারণ। কত বড় শহর, এত কোলাহলেও আজ নিজেকে বেশ একা অনুভুত হয় আলভি'র মনে মনে বলে " সুপ্তি!!!.... দেখ!! আমি তো কাদতেও পারছি না.... বলতেও পারছি না!!.... সম্পর্কের বাধন কত ঠুনকো হয়!!... তুই নাহয় আমার শখের মানুষই থাক!!... তোরই ভালো এতে....আমি চাইলেও যে তোকে পাবো না!!.....বলতে পারিস!!... আজ এই কোম্পানি আলাদা হওয়ার অর্থ কি?!.....আমার এত...এত প্রশ্ন.... উত্তর নাই কেন!!....সুপ্ত!!... আমাকে দিনশেষে তোরই কমপিটিটর হতে হবে!!... আমার তো সব থেকেও কিছুই নাই আজ!!....সবই মরিচীকা!!..... হাহ!!...."
মাথা নিচে ঝুকিয়ে এমন সব কথাই ভেবে যাচ্ছে আপন মনে। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে একটি দ্রুত গতির গাড়ি হর্ণ বাজিয়ে চলে যেতে সচেতন হয় আলভি। গা ঝারা দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এভাবে তো রাস্তায় বসে কাটিয়ে দেয়া যাবেনা। বন্ধ ফোন চালু করতেই সুপ্ত'র মেসেজ ঢোকে। মেসেজ পড়ে আলভি'র চোখ বড়বড় হয়ে যায়, অস্ফুটস্বরে বলে " শীট!!...."
ড্রাইভার কে কল দিয়ে নিজের অবিস্থান জানিয়ে বলে " দ্রুত আসো!!.... "
--------------------------
ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় সুপ্তিকে। মি. ফারহান ডাক্তার নিয়ে আগেই অপেক্ষায় ছিলেন হসপিটালে। সুপ্তি কে নিয়ে যাওয়া হয় কেবিনে। ডাক্তার সবাই কে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে নার্স কে নিয়ে ভিতরে চলে যান। মিসেস সাবিহা অঝরে কেদেই যাচ্ছেন, মি. ফারহান এসে তার পাশে বসে শান্তনা দেন। মি. ফারহাদ আর অনিতা কেবিনের দরজার পাশে উগ্রিব হয়ে অপেক্ষা করছে।
সুপ্ত ধীর পায়ে হসপিটালের করিডরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, চোখ ছলছল করছে। ছোট বোন'টা কে নিয়ে অজানা আতংক বিরাজমান মনে ভিতর। অপরদিকে আলভি'র এভাবে চলে যাওয়া কে অনুমান করতে পারছে কিছুটা কিন্তু পরিস্থিতির জন্য চেপে আছে। ছোট থেকে নিস্বার্থ ভাবে একমাত্র আলভি'কে পাশে পেয়েছে। আজ এসব একা সামলাতে হতো না যদি সে তাকতো। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিলো সুপ্ত হঠাৎ অনুভব করে কেউ তার কাধে হাত রেখেছে..........