লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার

সুপ্ত ধীর পায়ে হসপিটালের করিডরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, চোখ ছলছল করছে। ছোট বোন'কে নিয়ে অজানা আতংক বিরাজমান মনের ভিতর। অপরদিকে আলভি'র এভাবে চলে যাওয়া কে সামান্য অনুমান করতে পারছে কিন্তু পরিস্থিতির জন্য চেপে আছে। ছোট থেকে নিস্বার্থ ভাবে একমাত্র আলভি'কে পাশে পেয়েছে। আজ এসব একা সামলাতে হতো না যদি সে পাশে থাকতো। রাতের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিলো। চকিতে অনুভব করে কেউ তার কাধে হাত রেখেছে, হৃদস্পন্দন তড়িৎ বৃদ্ধি পায় কোথাও এ হাত আলভি'র নয়তো! দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় সুপ্ত,,,
: সুপ্ত!!...... বলে অনিতা
: হুম্মমহ!... বল!...
: এতো চিন্তার করিস না... সুপ্তি ঠিক হয়ে যাবে!...
: হাআহ!!... সুপ্ত'র দীর্ঘশ্বাস।
: সুপ্ত!!....আমাকে বলবি... ঠিক কি হয়েছে?....
সুপ্ত ক্ষানিকক্ষন মাথা নিচু করে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে, মুখ তুলে অনিতা'র দিকে চেয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বলে " আমাদের কোম্পানি সেপারেট হয়ে গেছে আজকে!!......"
: কিহ!... কেন?...তাজ্জব বনে যায় অনিতা।
: কিছুই জানিনা!!....
অনিতা কিছু বলতেই যাবে তৎক্ষণাৎ তারা লক্ষ্য করে ডাক্তার সুপ্তি'র কেবিন থেকে বের হচ্ছেন। ব্যাস্ত হয়ে মি. ফারহান জানতে চান তার মেয়ে এখন কেমন আছে। ডাক্তার সাহেব স্মীত হেসে কাধে হাত রেখে বলেন " প্লিজ! কাম ডাউন!.....নাউ সি'জ আউট অব ড্যাঞ্জার..... অ্যাকচুয়ালি দ্যা এফেক্ট'স অব প্যানিক এট্যাক!!.....এন্ড ইট'স দ্যা ফার্স্ট টাইম!........"
সুপ্ত বিস্মিত কন্ঠে বলে " প্যানিক এট্যাক?!!...."
: ইয়েস!.... উম্মম... হয়ত এমন সিচুয়েশনে মিস সুপ্তি ছিলেন.... যেটা উনার জন্য বেশ যন্ত্রণার ছিলো......
: তাহলে... ডক্টর আ... আমার মেয়ের এখন কি হবে?!.... চিন্তিত কন্ঠে বলেন মি. ফারহান।
: এটা নরমাল!!... এখন উনার পর্যাপ্ত রেস্টের প্রয়োজন.... ইনশাআল্লাহ... কাল ডিসচার্জ হয়ে যাবে!....
: আমরা কি একটু দেখা করতে পারি?.... পাশ থেকে বলেন সুপ্তি'র চাচা মি. ফারহাদ।
: সিউর!!.... বাট বি কেয়ারফুল!!.... সে যেন উত্তেজিত হয়ে না যায়......
ডাক্তার সাহেব বিদায় দিয়ে চলে যান। সবার আগে সুপ্ত কেবিনে প্রবেশ করে পরে একে একে সবাই ভিতরে আসে। অবশ চোখদ্বয় বুজে ক্লান্ত শরীরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে সুপ্তি, হাতে ক্যানোলা দেয়া, নার্স সেটা ঠিক করে এক পাশে সরে দাড়ান। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে রীতিমতো ফুপিয়ে উঠেন মিসেস সাবিহা। সুপ্ত ধীর পায়ে এগিয়ে আলতো হাতে বোনের কপাল ছুঁয়ে দেয়। চোখ মেলে তাকায় সুপ্তি ভাইকে দেখে ঈষৎ হাসি দেয়। জড়ানো কন্ঠে সুপ্ত বলে " ক....কেমন আছিস আপুনি?!..." ইশারায় উত্তর দেয় সুপ্তি সে ভালো আছে। সুপ্ত আর কিছু বলতে পারেনা, চোখের জল গড়িয়ে পরে দ্রুত হাতে সেটা মুছে বাবা মা কে কথা বলতে বলে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। সবাই অল্প স্বল্প কথা বলে সুপ্তি'কে বিশ্রাম করতে বলে বিদায় নেন।
অসহায় চোখ দুটো মেলে সুপ্তি কেবিনের দরজার দিকে চেয়ে থাকে, প্রতিক্ষা হয়ত সে একটি বার আসবে তাকে দেখতে। কিন্তু তার অধীর অপেক্ষায় ধূলো দিয়ে কাঙ্খিত মানবের দেখা মেলে না। কষ্ট চেপে রাখতে না পেরে ফুপিয়ে ওঠে সুপ্তি, নোনাজল গড়িয়ে বালিশ ভিজে যায়। নার্স সজাগ হয় সুপ্তি'র ক্ষীণ কান্নার শব্দে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে " ম্যাম!!.... এখন আপনার ঘুমের প্রয়োজন....মেডিসিন দেয়া হয়েছে....ঘুমানোর চেষ্টা করুন......"
চোখের পানি এক হাতে মুছে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানায় সুপ্তি। ক্ষানিকবাদে সুপ্তি অনুভব করে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, সবকিছু ঘোলা হয়ে যায়।
-------------------------
ঘড়িতে রাত তিন টা।
ওয়েটিং রুমে অনিতা মি. ফারহাদ আর সুপ্ত বসে আছে। মি. ফারহান মিসেস সাবিহা কে নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। কারণ মিসেস সাবিহা কিছুটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন।
সুপ্ত আনমনে ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রলিং করে যাচ্ছিলো। হঠাৎ উপরতলার সিঁড়ি থেকে কয়েকজন মহিলার কান্নার শব্দ ভেসে আসে। স্পষ্টতই তাদের স্বজন ইহলোক ত্যাগ করেছেন বলে এ আহাজারি। রাতের গভীরতায় ওয়েটিং রুমের অনেকেই ঝিমচ্ছিলেন তারাও সজাগ হয়ে যান। কয়েকজন আবার দেখতে যান কিভাবে কি হলো।
হসপিটালে না আসলে কখনো অনুভব হয় না পৃথিবীতে এত গর্ব অহংকারের পরও একটা মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে। কত নিরাময়হীন রোগ, কত শোক, কত বেদনা। সুপ্ত'র ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রুত পদে পা বাড়ায় লিফটের দিকে, সুপ্তি'র কেবিন সিক্সথ ফ্লোরে।
কেবিনের করিডরে এসে অবাক হয়ে যায় সুপ্ত। নার্স কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। রাগে ফুসে এগিয়ে আসে সুপ্ত " কি ব্যাপার?!... আপনি কেবিনের বাইরে কেন?!!.... "
অপরাধের সুরে নার্স বলে, "আস্তে বলুন স্যার!... অন্য কেবিনেও রোগীরা আছে!!..."
: সো হোয়াট?!!... আমার বোনকে এভাবে রেখে....... থেমে যায় সুপ্ত।
কেবিনের দরজা দিয়ে দেখতে পায় ভিতরে একজন কালো পোশাকাবৃত্ত ব্যক্তি সুপ্তি'র বেডের পাশে বসা। হুড়মড়িয়ে কেবিনে প্রবেশ করে সুপ্ত। চেহারাবৃত করার ব্যক্তিটি সচেতন হয়ে যায়। সুপ্ত কে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে খপ করে হাত ধরে ফেলে মুহূর্তে চেহারা অনাবৃত করে দেয় সুপ্ত। বিস্মিত হয়ে দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে বলে,,,,,," আলভি!!!......."
ঘটনার আকস্মিকতায় দুজনেই ইতস্তত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে একে অপরের মুখোমুখি। বেচারা নার্স ততক্ষণে কেবিনের ভেতরে চলে এসেছে, গুটিশুটি হয়ে চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে যায়।
: ওর খেয়াল রাখেন.....আমরা বাইরে যাচ্ছি........ গম্ভীর কন্ঠে কথাগুলো বলে আলভি বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।
দুজনেই চুপচাপ করিডরে হেটে যাচ্ছে। কিছু সময় অতিবাহিত হলে গলা খাকারি দিয়ে সুপ্ত প্রশ্ন করে বসে, " আলভি!!.... এভাবে আসার মানেটা কি??..... জানিস!!.... আমি তোর কত অপেক্ষা করেছি!......."
আলভি কোন উত্তর না দিয়ে স্মীত হেসে তাকায় সুপ্ত'র দিকে।
আলভি'র এমন দৃষ্টি সুপ্ত'কে বিচলিত করে, সে স্পষ্ট পড়তে পারছে আলভি'র না বলা কথার ঝড়। ফের জিজ্ঞেস করে সুপ্ত "তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?!!....."
: হুমমম....
: এ অবস্থায় কেন এসেছিস?!!....
: কেন?!.... আমার উপস্থিতি কি তোর পছন্দ হয়নি?!!....
: এমন করে কেন কথা বলছিস ভাই!!...
: আহহ!!...আমি আসলে মরীচিকার পিছে আর ছুটতে চাই না!!!.....
: আমরা তোর কাছে মরীচিকা মনে হয়?!!....
: নারেহ!!...তাহলে তো আর আসতাম না!....
: আমি জানি ভাই আজকে যা কিছু হয়েছে.....সবকিছুই অ্যাবনরমাল ছিল!!!.... কিন্তু তুই এভাবে.... আমাকে দূরে সরিয়ে দিবি!!....এটা সত্যিইই বিশ্বাস হচ্ছে না!....
আলভি পুনরায় অর্থপূর্ণ হাসি দিলেও কোন উত্তর দেয় না।
আলভি'র হাবভাব এলোমেলো দেখে সুপ্ত এক প্রকার জোর করে হাসপাতালের ক্যান্টিনে যেয়ে দুই কাপ কফির অর্ডার দিয়ে বসে। ঠান্ডা গলায় বলে,,, " আলভি ভাই আমার!!..... আমি এখনো তোর সেই সুপ্তই আছি!... যেটা আমরা ছোটবেলায় ছিলাম... তুই এভাবে আমাদের ছেড়ে যাস না...."
: উম্মমহ!!....তোদের না বল তোকে!!....
: আচ্ছা বেশ!!... আর সুপ্তি?...
: হাআহ!!.... সময় বলবে সেটা....
: হুম্মম.... কোথায় যাবি এখন?...
: আমাদের পুরনো বাড়িটা তে...
: আমাদের সাথে থেকে গেলে কি খুব ক্ষতি হতো?!!....
: রাজ্যের বাদশাহ একজনই হয়.....তাছাড়া এখন প্রশ্নটাই স্ট্যাটাসের হয়ে যাবে!!!......
: হুম্মম্ম.... আমি তোকে বাধা দিচ্ছি না.... কিন্তু তাই বলে এভাবে হুট করে....
ক্ষীণ কন্ঠে আলভি বলে " আই'ম এক্সট্রিমলি সরি!!..... "
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সুপ্ত বলে " তুই কি জানিস?... সুপ্তি'র প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে?!!..... "
মাথা নুয়ে আলভি জবাব দেয় " হুম্মম...."
: যার একমাত্র কারণ ছিলি তুই!!.....
আলভি অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকায় সুপ্ত'র দিকে, ব্যথাতুর কন্ঠে বলে " আই নো দ্যাট.... কিন্তু!.... জীবন রেখা সব সময় সমতল হয় না!!!..........."
আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে বিদায় জানিয়ে চলে যায় আলভি।
স্থির দৃষ্টি নিয়ে ওর চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে সুপ্ত কানে বাজছে চেহারাবৃত ব্যক্তিটির কথা,,,, " তুই চিরকাল আমার গভীর অনুভবের সাথী!!!............"
-------------------------
আজ সুপ্তি'র ডিসচার্জ হয়েছে। অনিতা কল দিয়ে মিসেস সাবিহা কে জানিয়েছে তারা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে। মিসেস সাবিহা রান্নাঘরে ভিষণ ব্যস্ত, মেয়ের পছন্দের খাবার স্বল্প সময়ে যতটুকু পারা যায় সবই রান্না করছেন। মায়ের মন এমনিই হয়।
মিসেস রুমানা ঠাট্টা করে বললেন " ভাবি তুমি যেভাবে তোড়জোড় করে আয়োজন করছো..... মনে হচ্ছে মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছে.. হাহাহা......"
: আসলে... মেয়েটার এভাবে অসুস্থ হওয়াতে মনটা বড্ড খারাপ ছিল গো.....যাক এখন তো সুস্থ!!!.......
কথার ফাঁকে বাসার দরজায় কলিংবেল বেজে ওঠে। মিসেস সাবিহা দ্রুত পদে ছুটে যান দরজা খুলতে। ইতোমধ্যে মি. ফারহানও নেমে এসেছেন নিচ তলায়। সুপ্তিকে দেখে বুকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করেন মিসেস সাবিহা। সুপ্তিও ছোট্ট বাচ্চার মতো মায়ের আদর অনুভব করে। হাসিমুখে মি. ফারহানও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। সখ্য, কাকিমনি সবার সাথে আলাপ শেষ হলে মি.ফারহাদ সুপ্তি'কে নিজের ঘরে যেতে বলেন ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
রুমের সামনে এসে থমকে যায় সুপ্তি, ব্যথাতুর নয়নে আলভি'র দরজার দিকে চেয়ে দেখে। নিজের অজান্তে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘ গভীর শ্বাস। বুকের চিনচিন ব্যাথাটা অশ্রুতে পরিণত হয়ে গড়িয়ে যায় গাল বেয়ে। কাল রাতের প্রতিটা স্মৃতি প্রতিটা কথা একে একে আবার মনে পরতে থাকে সুপ্তি'র। অতি সাবধানে রুমের দরজা বন্ধ করে ছুটে যায় বেলকনিতে, কোথাও যদি একবার দেখা মিলে আলভি'র। হতাশার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে গতরাতের ল্যাম্পপোস্টের দিকে। সুপ্তি অনুভব করে নিজেকে মিথ্যে প্রবোধ দিয়ে লাভ নেই, ধীর পায়ে বিছানায় এসে বসে। চোখ যায় আলভি'র দেয়া গিফট বক্সের ওপর। দ্রুত হাতে সেখান থেকে একটি ক্যান্ডেল বের করে, সেটাতেও একটি চিরকুট বেঁধে রাখা ছিলো। কাঁপা হাতের কাগজের ভাঁজ খোলে তারিখটা ছিল দশম জন্মদিনের তাতে লেখা রয়েছে,,,,
" তোর সাথে কাটানোর ইচ্ছায় এক বুক তৃষ্ণা এ হৃদয়ে......."
চিরকুটটি বুকে আগলে ডুকরে কেদে ওঠে সুপ্তি।
চিঠিতেই মগ্ন ছিল এমন সময় চকিতে সুপ্তি লক্ষ্য করে দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ। দ্রুত হাতে ক্যান্ডেলটা আবার বক্সে রেখে নিজেকে একবার আয়নায় দেখে পরিপাটি করে দরজা খোলে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাণপ্রিয় বান্ধবী নাবিলা। মৃদ্যু হেসে ভিতরে ডাকে সুপ্তি,,,,,
: আরেহ!!.... নাবু তুইই!!...আয়!!....
: হ্যাঁ রে!.... কেমন আছিস এখন!!.....
: ভ... ভালোহ!!... তুই কিভাবে জানলি?....
: সুপ্ত ভাইয়া বললো....
: হুম্মম....
: হঠাৎ.... কি হয়েছিল?!!....
সুপ্তি স্মীত হেসে বলে " জানিনা রে!!....."
নাবিলা সুপ্তিকে আপদামস্তক পরখ করে বলে " ভনিতা না করে আমাকে তো বল!!......"
: বললাম তো কিছুই না!!....
: হুম্মম্ম.... তাইনা?!!.... থাম আলভি ভাই কে ডাকি..... তুই ওনার কথা ঠিকি শুনবি......
মেকি হেসে অন্যমনস্ক হয়ে সুপ্তি বলে " হুমহ!!... উনি আর কোনদিনই এবাড়িতে আসবেন না!!....."
: কেন?!!!.....
: উম্ম??.... কি জানি?....
: এই শোন!!... পাশ কাটাবি না!!.... সত্যি করে বলতো কি হয়েছে তোর?!!....মাইর দিবো কিন্তু....
: সব সময় সত্যি বলতে নাই.... এরচেয়েও বড় কথা আবেগের নিয়ন্ত্রণ করা উচিত.....
: কোথাও তুই আলভি ভাই কে....
: উফফফ!!.... কি যাতা...
: থাম!... দরজা লাগিয়ে দিই..... বলে নাবিলা দরজা লাগিয়ে আবার এসে সুপ্তি'র পাশে বসে। ওর এক হাত ধরে বলে " দেখ!!... আমি বড় মানুষ না!... কিন্তু তোর ভালো বান্ধবী তো??...."
: হুম্মম্ম...
: ওকেহ!!.... তাহলে এত কিছু না ভেবে বল... কেন এত কষ্ট পাচ্ছিস?!!.... যে তোর প্যানিক এট্যাক হয়েছে!!!......
: আলভি ভাইয়া চলে গেছে....
: কোথায়?!...
: জানিনা....
: তুই এটার জন্য কষ্ট পচ্ছিস?!!....
: আহ!!... হুম্ম...
: নাহ!!.... তুই সত্যি টা বললি না!!....
: কিভাবে বলি বল!!.... আমি মেয়ে.... আর মেয়ের মানে বুঝিস?!!.... একটা মেয়ে তার বাবা....ভাইয়ের সম্মান.... তাই আমি কিছুই বলবো না!!......
: হুম্মম.... এটা অনেক দামী কথা!!.... তুই নিজে যখন এতো টা বুঝে গেছিস... নিশ্চয় ভুল কিছু করবিনা!!.....
: হুম্মম্ম..... চেষ্টা করবো!....
: যা বান্ধবী!!...ফ্রেশ হয়ে আয়!.....আমি তোর খাবার নিয়ে আসি....
: আরেহ তুই বোস!!.....আমি দু মিনিটে বের হয়ে যাবো.....
সুপ্তি ফ্রেশ হয়ে নাবিলাকে নিয়ে সবার সাথে সকালের নাস্তা করতে বসে। মিসেস সাবিহা সুপ্তিকে জোরাজোরি করলেও সে অল্প কিছু ওটস আর চিকেনের কয়েক পিস নিয়ে খাওয়া শেষ করে। সুপ্তও আনমনে খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলো। অনিতা চাপা কন্ঠে ঠিক মতো খেতে বললে সে চোখের ইশারায় আলভি'র রুম দেখায়। অনিতা খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে আলভি'র অনুপস্থিতিতে, ওরা দুই ভাই-বোন ছাড়া এ বাড়ির অন্য কারো তেমন কোন প্রভাব নেই। অনিতাও এক প্রকার অনিচ্ছা সত্ত্বে জোর করে কিছু খাবার গলধ করণ করে চলে যায় নিজের রুমে।
ঘরে এসে নাবিলা সুপ্তিকে অনুরোধ করে শরীর ভালো লাগলে কলেজ যেতে সবার সাথে দেখা সাক্ষাত হলে মনও ভালো হয়ে যাবে। সুপ্তি'র কাছে প্রস্তাব টা মন্দ মনে হয়না। যদিও মিসেস সাবিহা চাচ্ছিলেন আজকের দিন অন্তত বাসাতেই থাকুক সুপ্তি।
কফি বোরকা আর সাদা হিজাব যদিও সুপ্তি'র কলেজ ড্রেস তাও অদ্ভুত সুন্দর লাগে মেয়েটাকে এমন পোশাকে।
সুপ্ত অফিসে যাওয়ার পথে দুই বান্ধবী কে নামিয়ে দেয় কলেজে।
অপরদিকে,,,,,,
অনিতা ক্লান্ত শরীরে শুয়ে আছে বিছানায়। ঘুমানোর শত চেষ্টা করলেও সুপ্ত'র বলা কথা গুলো মনে হতেই অস্বস্তি ভাব বেড়ে যায়। ফোন হাতে বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বড় ভাই কে কল দেয়,,,,,,
: হ্যাঁ.... ভাইয়া!!....
: বল!... সুপ্তি কেমন আছে?...
: ভালো....
: সুপ্ত?!...
: ওরা দুই ভাই বোন চেষ্টা করছে ভালো থাকার.....
: হুমহ!!... একটু ঘুমা!... সারারাত তো বসেই ঝিমাচ্ছিলি....
: ত...তুই কিভাবে জানলি?!....
: গিয়েছিলাম.....
: হুম্ম.... বলছি ভাইয়া!....আমি আসি তোর কাছে?!!....
: বোনু!!.... এভাবে বলছিস কেন??....
: আ... আমার এখানে মোটেও ভালো লাগছে না....
: গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি আয়....
: ভাইয়া!!....
: হুম্মম?...
: আমার আরো কিছু জানার আছে.....
: আগে আয় তো!... বলবো!!.....
ভাইয়ের সাথে কথা বলে অনেক টা স্বস্তি অনুভব হচ্ছে অনিতার।
-------------------------
ফারহান এগ্রো লিমিটেড
সাজসাজ রব চারিদিকে। কর্মচারীরা বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত, আজ তাদের নব্য নির্বাচিত সিইও সাহেব আসবেন। নতুন দিকনির্দেশনায় তার অধীনে চলবে ফারহান এগ্রো লিমিটেড এর সকল কার্যক্রম। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি কালো জিপ গাড়ি কোম্পানির মেইন গেট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসা তরুণ সিইও কে দেখে সকলেই কিছুটা ভিমড়ি খায়। আড়ম্বরহীন হাস্যজ্বল চেহারার যুবক। পোশাকে সাদা কালো রঙের স্যুট-কোট কম্বিনেশন। সকলের ফুলেল শুভেচছা গ্রহণ করে ভিতরে প্রবেশ করে সুপ্ত। একজন বয়স্ক স্টাফ তাকে তার অফিস কক্ষ পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।
সুক্ষ্ম ভালোলাগা অনুভব হয় সুপ্ত'র। মৃদ্যু হেসে ভিতরে প্রবেশ করে। শীত তাপনিয়ন্ত্রিত কামরায় একটা বড় জানালা উত্তর দিক বরাবর এবং তার ঠিক সামনে রাখা মোটামুটি বৃহদাকারের টেবিল, তার ওপরে রাখা ক্যালেন্ডার, ছোট্ট ফ্লাওয়ার ভাজ আর পেন হোল্ডার। তিনটে চেয়ারও আছে। এছাড়াও দেয়ালে আর্ট ওয়ার্ক করা। সুপ্ত বেশি অবাক হয় তার সবচেয়ে পছন্দের দেয়াল ঘড়ি দেখে। মনেমনে বাবা কে অনেক কৃতজ্ঞতা জানায় এত সুন্দর করে সব গুছিয়ে দেয়ার জন্য।
মনের খুশিতে অনেক কিছুই ভাবছিলো এমন সময় ফোন কলের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে সুপ্ত'র। স্ক্রিনে নাম্বার দেখে দ্রুত রিসিভ করে বলে,,,,,,
: হ্যাঁ অনিতা!!.... বল...
ওপারের কথা শোনা যায় না, সুপ্ত একটু অস্থির হয়ে বলে " কিহ!!..... না...না... আমি আসছি!!......" বলে লাইন কেটে দ্রুত বেরিয়ে যায়।
মিনিট ত্রিশ পরেই কনফারেন্স রুমে তাদের মিটিং আছে আর এভাবে সিইও সাহেব কোথায় চলে গেলেন ভেবে স্টাফরা সকলে একে অপরের মুখ চাওয়া চায়ি করতে থাকে।