লেখিকাঃ আবিদা সুলতানা

🚫🚫
কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ। যাদের অতিরিক্ত রোমান্টিক গল্প পছন্দ, তাদের জন্য এই গল্প নয়। অনুগ্রহ করে মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না। পুরো গল্প জুড়ে থাকবে ধোঁয়াশা, যা উদঘাটন করতে সত্যিকারের ধৈর্য প্রয়োজন। শুধুমাত্র রহস্যভেদে আগ্রহী পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত।
🚫🚫
*
*
নির্জন কক্ষে কৃত্রিম আলোর নিস্তেজ ছটায় আচ্ছন্ন, রুদ্রের দাবিকৃত মসৃণ তুলতুলে সাদা চাদরের উপরে পা তুলে বিশ্রামরত ঊর্মিলা বেগম। তাঁর পায়ে সেবা নিবেদনরত প্রিয়া, যত্নের সাথে তেল মালিশ করছে। কথোপকথন চলছে এক অদ্ভুত রহস্যময় ধাঁচে। প্রিয়া তার উদ্বিগ্ন কন্ঠে নীরবতা ভেঙে বলল,
——— "যদি রুদ্র সত্যটি জানতে পারে?"
ঊর্মিলা বেগম বাদামের খোসায় হালকা ফুঁ দিয়ে খেয়ে এক প্রশান্ত হাসি ছড়িয়ে বললেন,
———" আহ! পাগল হোস না তো! কেমন করে জানতে পারবে! আমি তো বলব না! আর তুই কি ওকে বলবি?"
প্রিয়ার তেল মাখা হাত দিয়ে মালিশ করতে করতে মাথা দুপাশে দুলিয়ে প্রতিবাদ জানাল অর্থাৎ না! ঊর্মিলা বেগম মৃদু হাসলেন এবং বললেন,
——— "তবে এত ভাবনার কী আছে?"
মাথা নত করে, হাতের কাজ চালিয়ে যেতে যেতে প্রিয়া হতাশা মিশ্রিত কম্পিত কন্ঠে বলল,
——— " যা করেছি, ওর ভালোবাসা অর্জনের জন্যই করেছি।"
ঊর্মিলা বেগম বললেন,
——— "আহহা! সে তো আমিই জানি! রুদ্রের সাথে তোর বিবাহ হবে; এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র! কিছুদিন সহ্য কর, ওর মনের প্রবণতা গুলো তো জানিস! সেগুলো কাজে লাগিয়ে ওর মন জয় কর। এরপর আমি ওকে বলব তোকে বিয়ে করতে! আমার কথা তো ফেলতে পারবে না!"
তবুও প্রিয়ার হৃদয়ের গভীরে অস্থিরতার ঝড়। মিথ্যার ভিত্তিতে নির্মিত কোনো সম্পর্কই কি চিরস্থায়ী হতে পারে? ভাবনা তার মনের প্রতিটি কোণে সঞ্চারিত হল। যদি একদিন রুদ্র সত্যিটা জানতে পারে—সে মুহূর্তে কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে! ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল প্রিয়া। কাঁপতে কাঁপতে বলল,
——— "আ-আমার যা কিছু, সব ভালোবাসার জন্যই করেছি! ভালোবাসায় পাপ-পুণ্যের বিচার নেই। কিন্তু, কিন্তু যদি রুদ্র জেনে যায়! ও আমাকে প্রাণে শেষ করে দেবে।"
ঊর্মিলা বেগমের কণ্ঠ আকস্মিক গাম্ভীর্যে ভরে ওঠে,
——— "ওই মেয়েটির মৃ'তদেহ আজও মেলেনি! হয়তো সে এখনও জীবিত! যদি সে ফিরে আসে?"
প্রিয়ার হাত তৎক্ষণাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। দেহের প্রতিটি অঙ্গ অবশপ্রায়, র'ক্ত হিম হয়ে আসে। আতঙ্কিত মুখে হাত চেপে ধরে ভগ্ন কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
——— "না, না! এত দীর্ঘকাল পার হয়ে গেছে, সে আর আসবে না! সেই শৈশব থেকেই রুদ্রকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল! আজ যখন আমি রুদ্রকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করতে চাইছি, তখন কি সে ফিরে এসে আমার রুদ্রকে পুনরায় ছিনিয়ে নেবে? না, না! আমি তা কোনো অবস্থাতেই হতে দেব না!"
ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন এক অশরীরী বাতাসের ঘূর্ণি কক্ষের নীরবতাকে বিদীর্ণ করে শব্দ করে খুলে গেলো দরজা! অন্তরে যেন হাহাকার বহন করা ক্লান্ত গম্ভীর মুখাবয়ব নিয়ে প্রবেশ করলো রুদ্র, কর্মফল সমাপ্তির বিষণ্ণতার ছায়া তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে। রুদ্রকে দেখেই যেন ঘরের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা দুশ্চিন্তার শ্বাপদ দুজনের আত্মাকে কামড়ে ধরল। নিঃশ্বাস থেমে এলো, ভেতরে যেন সময় থমকে গেলো। রুদ্র কিছু শুনেছে কি? এই উৎকণ্ঠা তাদের মনের অন্তরালের প্রতিটি কোণ আচ্ছন্ন করে তুলল। কিন্তু রুদ্র তাদের সমস্ত শঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত করে সেই মুহূর্তে এক অম্লান হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো ঊর্মিলা বেগমের দিকে, যেন কিছুই ঘটেনি, যেন কিছুই জানে না! তার স্নেহময়ী মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
——— "তোমার জন্য জিলাপি এনেছি ।”
এরপর রুদ্রের ঠোঁটের কোণায় এক মৃদু ভ্রুকুটি দেখা দিলো, চোখের গভীরে বিদ্যুৎ চমক দিয়ে বলল,
——— "তবে একটুখানি খেতে পারবে! বেশি নয়...!”
ঊর্মিলা বেগম ও প্রিয়া যেন সেই এক লহমায় তাদের শিরায় বয়ে চলা আতঙ্কের শীতলতা থেকে মুক্তি পেল। তাদের হৃদয়ের গোপন স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল, কিন্তু এবার যেন তারা বেঁচে ফিরল। কলিজায় শীতল পানি নেমে এল! তারা উপলব্ধি করল, রুদ্র কিছু শোনেনি। ঊর্মিলা বেগমের মিষ্টি খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাঁর প্রবল ইচ্ছা ছিল! বৃদ্ধ বয়সে যে সুকোমল ইচ্ছাগুলো দহন করে তাঁকে, তারই প্রতিচ্ছবি যেন জিলাপির মধ্যে বন্দী। রুদ্র বাধ্য হয়ে তাকে এনে দিয়েছে, কিন্তু তার নিরীক্ষণ থাকবে সজাগ, যেন চাচির অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দমন করা যায়।
রুদ্র আবারো সেই মায়াবী হাসির আভা দিয়ে ঊর্মিলা বেগমের গালে হাত বুলিয়ে বলল,
——— "আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি, চাচি। আমি না আসা পর্যন্ত একটুও মুখে দেবে না!”
তারপর প্রিয়ার দিকে সে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালো, যে এতক্ষণ তার দিকেই চেয়ে ছিল! কঠিন কণ্ঠে, নির্দেশ ভেসে এলো,
——— "এই মেয়ে, আমি আসা পর্যন্ত খেয়াল রেখো ।”
রুদ্র আবারও ঊর্মিলা বেগমের দিকে এক ছায়া-ঢাকা হাসি দিয়ে, রুদ্র উল্টো পথে ধীর পায়ে অদৃশ্য হল!
কিন্তু দরজার বাইরে পা রাখতেই যেন রুদ্রের সমগ্র অস্তিত্ব বদলে গেল, মুখশ্রী মুহূর্তে পাথরের মতো কঠোর হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসির ক্ষীণ ছায়া নিমেষেই উধাও, কঠিন সংকল্পের শীতল ছায়া নেমে এল চোখের গভীরে। সময় থেমে যাওয়ার মতো ঠেকল, রুদ্রের সমস্ত ইন্দ্রিয় সতর্ক; একজন সিআইডি অফিসার কখনো তার চারপাশের ঘটনা অগোচরে রাখে না। প্রতিটি কথার ছায়ায় সে সত্যের সুরঙ্গ খনন করে।
আস্তে আস্তে ধীর পদক্ষেপে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে যেতে যেতে তার মনে প্রতিধ্বনি উঠল, ঠাণ্ডা, নির্মম স্বরে,
——— “ আমার পাখিকে তো আমি খুজে বের করবোই! তবে প্রিয়া উলটো দিন গুনতে থাকো। রুদ্র তোমার আসল পরিচয় খুঁজে বের করতে আর খুব বেশি সময় নেবে না।”
___________________
——— "বিশ্বাস? আহা, মূর্খদের বিলাসব্যসন মাত্র! প্রত্যেকেই স্বার্থপর, প্রতিটি হৃদয় প্রতারক। যাকে সর্বাধিক নিকট মনে করো, সেই-ই কাল তুমি অচেতন থাকাবস্থায় ছুরি বিদ্ধ করতে দ্বিধাবোধ করবে না। অতএব সাবধান—কাউকে বিশ্বাস করো না, নিজেকেও নয়!"
দেয়ালে পৃষ্ঠ আড়াল করে আঁখি অম্লমধুর হাস্যে উচ্চারণ করল কথাগুলো। তারপর নিঃশব্দে পা বাড়ালো বিদায়ের পথে। তবে যাওয়ার আগে দরজার ফাঁক দিয়ে আরেকবার তাকাল আছিয়ার দিকে—যে নিপুণ হাতে সতর্কতার সাথে আঁখির ব্যাগে একখণ্ড কাগজ রেখে দিচ্ছে। আঁখি সবকিছু জানার পরও, দেখেও অদেখার অভিনয় করে শুধু মৃদু হাসল এবং চলে গেল!
মিলির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তিনবার কবুলের ধ্বনিতে পূর্ণতা পেয়েছে! সমস্ত নিয়মকানুন, প্রথা, রীতিনীতি অনুসরণ করে বিয়ের সকল আয়োজন সমাপ্ত। আহার-অনুষ্ঠানও শেষে, এখন মিলির বিদায়ের ক্ষণ! বিদায়ের এ মূহুর্তে বাড়িময় কান্নার স্রোত বইছে, যেন প্রতিটি হৃদয় ভারাক্রান্ত। তবে, সেই অশ্রুধারার মাঝেও আঁখির দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না হঠাৎ আছিয়ার নিঃশব্দ পদক্ষেপ, যখন সে পা টিপে টিপে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল!
তবে আঁখি এখন নিজেকে অজানায় রেখেই এগিয়ে গেলো মিলির দিকে। যেখানে কান্নার স্রোত উথলে উঠেছে, সেখানে সারি সারি গাড়ির মধ্যে একটি ফুলে সজ্জিত গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফাহাদ, স্থির দৃষ্টিতে বিদায়ের প্রতীক্ষা করছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন সবাই গাড়িতে উঠে বসেছে, বিদায়ের মুহূর্ত গতি পেয়েছে। কিন্তু মিলি এখনো তার বাবার বুকে জড়িয়েই রয়েছে, বিচ্ছেদ তাকে ছিঁড়ে ফেলতে চায়। জবেদা বেগমের অবস্থা আরও করুণ; কান্নার ভারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এবং ইতিমধ্যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। তাকে ধরে ধরে সবাই ঘরের ভেতর শুইয়ে দিয়েছে, বিদায়ের সঙ্গী হয়ে শুধু নিস্তব্ধতা বয়ে চলেছে।
আঁখি নিঃশব্দে এগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো হাবিবুর রহমানের পাশে। ভিড়ের চাপ এতটাই ঘন, দাঁড়ানোই অসম্ভব হয়ে উঠেছে; তবু আঁখি দাঁড়িয়ে রইল, নিষ্কম্প। আঁখিকে দেখে মিলির দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো, আর মুহূর্তেই মিলি আঁখির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকভাঙা কান্নায় ফেটে বলল,
——— "তুই ভয় পাস না! কিছু হলে আমায় বলিস, কেও বিরক্ত করলে আমাকে জানাবি; তুলে আছাড় মেরে ফেলে দেবো!"
আঁখি তখন হুট করেই অঝোর ধারায় কেঁদে উঠল, যেন সব বাঁধ ভেঙে গেছে। হাবিবুর রহমান নিজের চোখের জল মুছে স্নেহভরে মিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, তাঁর গভীর চোখের অতলে চিরায়ত পিতৃস্নেহের নীরব সান্ত্বনা।
সেই মর্মস্পর্শী মুহূর্তে, আছিয়া হঠাৎ আবেগের অশ্রুতে ভেসে দৌড়ে এসে ভিড় ঠেলে মিলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল, স্নেহের তীব্র জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে চায়। অঝোর কান্নায় ভিজে উঠল চারপাশ। মিলি এক হাতে আছিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলল,
——— "আর শোন, তুই একটু ঝাঁঝ কম দেখাবি, ! বেশি ঝাঁঝ দেখাতে আসলে কিন্তু ঘু'ষি দিয়ে তোর নাক ফাটিয়ে দেবো!"
ওদিকে, আরাফ, নাঈম, মিনহাজ, রোহান আর তাদের সঙ্গের তরুণ প্রজন্মের দল বাড়ির উঠোনে চেয়ারে বসে নিজেদের আড্ডায় নিমগ্ন। এই কান্নাকাটি, বিদায়ের মর্মস্পর্শ তাদের যেন ছুঁতেই পারে না। তাদের কাছে এই আবেগের ঢেউ অপ্রাসঙ্গিক, নিষ্ফল। কিন্তু একমাত্র আরাফের হৃদয় কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, ভেতরের কিছু একটিতে নীরব আঘাত। কারণ আঁখির চোখের অশ্রু! এটা ভাবতেই তাকে অচেতন এক ব্যথার জগতে টেনে নিচ্ছে।
হাবিবুর রহমানের চোখ ক্রমে র'ক্তিম হয়ে উঠেছে; অশ্রু জমেছে বিষণ্ণতায়, বেদনায়। আঠারোটি বছর ধরে সযত্নে, স্নেহের পরশে মেয়েকে রাজকন্যার মতো গড়ে তুলেছেন। আর আজ সেই প্রিয় কন্যার বিদায়! কলিজার অন্তঃস্থল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে বিদায়ের কাঁটায়। ফাহাদ নীরব, অবিচল দাঁড়িয়ে আছে, স্তব্ধ চোখে দেখে চলেছে নিজের নববধূর অশ্রু-সিক্ত চেহারা, যদিও কিছু বলতে পারছে না, তবু সবকিছু যেন নিরবে অনুভব করছে।
এদিকে গাড়ির ভেতরে বসে মিলির শাশুড়ীর রাগে মুখমণ্ডল যেন আগুনের মত তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর মেয়ে পাশে বসে আছে, আর তিনি তাকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলেন,
——— "এই অতিরিক্ত আদিখ্যেতার কী প্রয়োজন? কালকেই তো আবার এখানে আসতে হবে! এমন আচরণ করছে যেন তাকে শ্বশুরবাড়িতে নয়, সরাসরি জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছি!"
মিলির নোনাস (স্বামীর বড় বোন) মুখ বাঁকিয়ে বিরক্তির সুরে যোগ করল,
——— "ঠিকই বলেছ, মা! এদের কান্ড দেখে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীতে নতুন একটা দিন শুরু হলো! রাত যে ক্রমশ গভীর হচ্ছে, সেটার কোনো খবর নেই! মনে হয় যেন আগে কেউ বিয়ে করেনি! উফ! আমার ভাই যে কাকে বিয়ে করল!"
হাবিবুর রহমান ভাঙা গলায় ফাহাদের হাত ধরে গভীর উদ্বেগে বললেন,
——— "আমার আদরের মেয়ে—প্রিয়তমা কন্যা, যার গায়ে টুকরো আঘাতও সইতে দিইনি কখনো। খাওয়া তার অমৃতপ্রিয়, শ্বাসকষ্টে ভোগে শৈশব থেকেই। ধূলির লেশমাত্রে ভেঙে পড়ে সহিষ্ণুতা, হাঁপিয়ে ওঠে অতিবাক্যে কিংবা পথিক শ্রমে। কোনো কাজ করাইনি তাকে দিয়ে। প্রথমে হয়তো তুমুল বিশৃঙ্খলায় আছন্ন করবে তোমার গৃহ, অপরিপক্ব হাতে বিভ্রান্ত হবে। তবু ক্রমে অভ্যস্ত হবে, সময়ের সাথে। তবে যদি তার ভার নেওয়া ক্লান্তিকর হয়, খাদ্য কিংবা ঔষধে অক্ষম হও—তবুও, তাকে নির্যাতন করো না, অবহেলা করো না। শুধু আমার কোলে ফিরিয়ে দিও। আমি তাকে আগলে রাখবো, যেমন রেখেছি আজন্ম।"
ফাহাদ হাবিবুর রহমানের হাত দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে একবার মিলির দিকে তাকালেন, এরপর গভীর দৃষ্টিতে তার শ্বশুরের দিকে চেয়ে বললেন,
——— "এ হবে তার শেষ অশ্রুবিন্দু! এরপর তার চোখে যে জল গড়াবে, তা শুধুই আনন্দের। শরীরের প্রতিটি রক্তকণা বেচে দিয়ে হলেও তাকে আমি সুখী রাখব! সে শুধু আমার অর্ধাঙ্গিনী নয়, সে আমার আত্মার সহযাত্রী—আমার দায়িত্ব, আমার অঙ্গীকার।"
ফাহাদের বচন শুনে যেন সকলের হৃদয় আশ্বস্ত হলো, একরূপ প্রশান্তির স্রোতে ভাসলো সবাই। এমন যত্নশীল স্বামী পেলে আর কিইবা চাই জীবনে? তবে ফাহাদের মাতার মন সেই আনন্দকে আশ্রয় করতে পারল না। তিনি বিমর্ষ মুখে ভাবলেন, "আমার পুত্র তো হাতছাড়া হলো, অচেনা পথের যাত্রী!"
শেষবারের মতো মিলি পিতার গলা জড়িয়ে ধরে গভীর মমতায় বলল,
——— "নিজের যত্ন নিও, বাবা। অতিরিক্ত পরিশ্রম করবে না যেন। ওষুধ সময়মতো খাবে, ভুলে যেয়ো না! মা'কে দেখে রেখো । শুভর খেয়াল রেখো! "
মিলির ভ্রাতা দূর হতে নীরবে নজর করছিল তার বোনকে, এক স্থির দৃষ্টিতে। যখন দেখলো তার প্রিয় বোনটি গাড়িতে আরোহন করবে, তখন আকস্মিক এক আবেগে ছুটে গিয়ে বোনের বুকে নিজেকে সমর্পণ করলো, তার অশ্রুধারা যেন বাধ ভেঙে বইতে লাগলো। কিছুক্ষণ এভাবে স্থিত থেকে, মিলি নিঃশব্দে গাড়িতে আরোহন করলো। জানালার পাশে বসে, ফাহাদ দৃঢ়ভাবে তার হাতটি আঁকড়ে ধরে। মিলির চোখ টলমল, জানালার বাইরে থেকে একে একে চেনা মুখগুলোকে শেষবারের মতো অবলোকন করলো, যেন এই মুহূর্তটি কখনোই মুছে না যায়।। তখনই আঁখি হেটে গিয়ে, আর্ত হস্তটি জানালার ভেতরে প্রবেশ করিয়ে, মৃদু স্পর্শে মিলির অশ্রুবিন্দুগুলো মুছে দেয়! বলে উঠে কিছু কঠিন কথা,
——— "মিলি, এই সকল মিষ্টিমাখা হাসি আর সাজানো মুখাবয়বের অন্তরালে যে কী ছলনার ছায়া লুকায়িত, তা কি জানিস? কারো কথার মোহে পড়ে কখনো চোখ বন্ধ করিস না! মনে রাখ, মানুষের প্রদর্শন সর্বদাই প্রকৃত সত্যের প্রতিচ্ছবি নয়! যা চোখে ধরা পড়ে, তার আড়ালে আরেকটি মুখ পর্দার মতো সেঁটে থাকে। আর অতিরিক্ত মায়ায় পা বাড়াস না কারো প্রতি, যতই আপন ভাববি, ততই নিজেকে ফাঁদের গভীরে জড়িয়ে নিবি। বিশ্বাস, ভালোবাসা—সবই কেবল মরীচিকা! এই জগতে ভ্রান্তি ও ছলনা ঘিরে রয়েছে। তাই দুই নয়ন সর্বদা খোলা রাখিস, কেন তা জানি না, তবে এটাই বলছি— খোলা রাখিস!"
আঁখির এই কঠোর ও গভীর বাণী শুনে ফাহাদের বিস্ফারিত দৃষ্টি আঁখির ওপর স্থির হলো! আঁখির চোখে জল, অথচ মুখে এমন দৃপ্ত তেজ, যেন তার প্রতিটি শব্দের মধ্যে ছিল গভীর কোনো অন্তর্দাহ। মিলি এবার কান্না সহসা থামিয়ে দিলো.! একবার মাথা ঘুড়িয়ে ঢোক গিলে তাকালো! এই মেয়ের কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? গাড়ির ভেতরে বসে থাকা প্রত্যেকেই আঁখির এমন স্পষ্ট ও কটু বচনে স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। সাধারণত বিয়ের পর মেয়েদের শেখানো হয় কিভাবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়, কেমন করে বুঝদারী করতে হয়। তাছাড়া, যদি এমন কঠিন কথা বলা হয়ও, তা হয় তো নীরবে, কানে কানে বলা হয়। কিন্তু এখানে সকলের সম্মুখে, বিদায়ের মূহূর্তেই বিয়ের রাতে এমন অপ্রিয় কথা তোলার সাহস, তাও এমন সবার সামনে, শ্বশুরবাড়ির লোকেদের মনে বেশ অপমানের দাগ কেটেছে।
গাড়ির ভেতরে ফাহাদের দুলাভাই সহ আরও দুইজন আত্মীয় বসে। ধন্যবাদ ফাহাদের মা এই গাড়িতে নেই, নইলে তাঁর উত্তেজনায় যে কী ঘটত, তা বলা ভার। তবে দুলাভাইয়ের মনে আঁখির কথাগুলো প্রবল ক্রোধের জন্ম দিল। তিনি আঁখিকে মনে মনে বেয়াদব বলেই আখ্যা দিলেন। এতটুকুনি মেয়ের মুখে এত বড় কথা! তবে তিনি জানেন এই মেয়ে চেয়ারম্যান এর ভাতিজি! তাই বোধহয় এত অ'সভ্য আর অহং'কারী চোখে মুখের তেজ দেখেই তা স্পষ্ট! তবে তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান লোকদের সামনে এই কথা বলা, তাঁর মর্যাদার সঙ্গে যেন একরকম ব্যঙ্গের সমান।
ফাহাদ শব্দ করে হেসে উঠল, কৌতুকপূর্ণ ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
——— “বাহ! শালিকা তো বেশ কঠোর, তাই না? চিন্তার কিছু নেই, তোমার বান্ধবীর কিছু হবে না!”
আঁখি, সম্মানের সুরে হাসি দিয়ে বললো,
——— “আপনি কি ভাবেন, খেয়াল না রাখলে আপনাকে ছেড়ে দেবো, দুলাভাই?”
প্রতিত্তোরে ফাহাদ শুধুমাত্র হাসল! যাক, তার শালিকা পান্সুটে নয়, বরং যে মেয়েটি কথাই বলেনি তার সঙ্গে! এখন বলছে, তাও এক দৃষ্টান্তমূলক ধমক দিয়ে। বাহ! বান্ধবী তো বানিয়েছে এক নান্দনিক সম্পর্কের ছাঁচে।
ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করতেই শো শো করে গাড়ি অন্ধকার রাত্রির নীরবতার ভেতর মিলিয়ে গেল। একে একে সারি সারি সব গাড়ি যেন গভীর নিশীথের পর্দায় হারিয়ে যেতে লাগল। সকলেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, দূর থেকে গাড়ির আলোগুলি নিস্তব্ধ রাত্রির মধ্যে ঝাপসা হয়ে গেল।
আছিয়া আঁখির কঠিন কথাগুলি শুনে ভেতরে ভেতরে কাঁপল। আঁখি কি তবে কোনোভাবে সব জেনে গেছে?
আঁখি ইচ্ছাকৃতভাবেই সকলের সম্মুখে কথাগুলি উচ্চারণ করেছে! প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে বিদ্যমান অহং'কারের জ্বলন্ত শিখা সে অনুভব করেছিল, যা তাদের দৃষ্টিতে প্রতিফলিত হচ্ছিল। মানুষের চোখের চাহনিতেই তাদের অন্তর্জগতের বক্রতা প্রকট হয়ে ওঠে! মিলির শ্বশুরালয়ের লোকদের প্রতি আঁখির মনে অসহায় বোধের ছাপ পড়েছিল—তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টি তাচ্ছিল্যের তীর হয়ে মিলির অস্তিত্বকে বিদ্ধ করছিল, বিরক্তির ছায়া যেন প্রতিটি চক্ষুর কোণায় ঝিলিক মারছিল। তবে ফাহাদ এবং তার পিতা এই বিষম পরিবেশের একমাত্র ব্যতিক্রম। তবুও এতটুকু পর্যবেক্ষণে সত্য উপলব্ধির দ্বার মেলে না!
--
এসব কিছুই দূর থেকে স্থির ও গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে অমোঘ এক হাসির আভাস এলো, কিন্তু মুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল; যেন কেউ দেখতে পাওয়ার আগেই সে নিজেই সেটিকে লুকিয়ে ফেলল! গাম্ভীর্যের এক অনড় মুখাবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। এখানে তার অবস্থান কেবল সুহানা বেগমের জন্য; অন্যথায় সে অনেক আগেই চলে যেত। কিন্তু মা বলেছে তার সাথে থাকতে, তাই অনন্তকাল ধরে সিগারেটের ধোঁয়া ফুকতে ফুকতে অপেক্ষা করছে; মায়ের আগমনের।
কিন্তু এখনো আসার নাম নেই! সেই যে গল্পগুজবের জালে বন্দী, আর তার ওপর জবেদা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন! তখন থেকেই সুহানা বেগমের কোনো সন্ধান নেই! মুগ্ধ গভীরভাবে শ্বাস ফেলল, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভার তপ্ত নিশ্বাসে মুক্তি খুঁজছে। "মা!"—মনোজগতে এক ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো। মানুষটা যেন এক রহস্য! অদ্ভুত এক সত্তা, যার কোনো তুলনা নেই; তার সবকিছুই অনন্য, অনুপম!
কিন্তু "মা" শব্দটি মনে আসতেই যেন পুরোনো স্মৃতির ভার মাথায় আছড়ে পড়ল! সেই স্মৃতির গহ্বর থেকে ফুঁসে উঠল অসহ্য এক ক্রোধ, গলিত লাভার মতো বয়েই চলেছে ভিতরটা। টগবগিয়ে রাগে উত্তেজিত হয়ে মুগ্ধ হাত দিয়ে মাথার চুল টেনে ধরল, যেন নিজেকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। তারপর দৃষ্টি ছুঁড়ল আঁখির দিকে; সে ভাবুক হয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে বাড়ির পথে!
আঁখি নিঃশব্দে বাড়ির পথে হাঁটছে, একাকী ধূসর ছায়া। শিকদার পরিবারের সবাই বিয়ের পর পরই কেটে পড়েছে, কিন্তু আঁখি থেকে গিয়েছে সাথে সবসময়ের মতো নাঈম! এখন সে তার ব্যাগ নিতে যাচ্ছে, নাঈমের সাথে যাবে বলে। একে একে প্রতিবেশীরা মিলিয়ে যাচ্ছে, ঘর শূন্য হয়ে পড়ছে। আছিয়া আঁখির চোখের অমোঘ চাহনি এড়িয়ে আগেই ঘরের অভ্যন্তরে লুকিয়েছে। আত্মীয়স্বজন, যারা মিলির বাড়িতে ভিড় করেছিল, একে একে অপসৃত হচ্ছে.
আঁখির মনের গভীরে আছিয়ার কথা বারবার ধ্বনিত হচ্ছে। এই চিঠি দেওয়া কাজটি যে আছিয়ার হাতেই হত, তা আঁখি জানে; এটা কোনো গোপন কথা নয়। কিন্তু এবার সে চিঠি দাতাকে খুঁজে বের করবে, এটুকু তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আরাফ যে নয়, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই; আঁখি বহুবার আরাফের হাতের লেখা দেখেছে, আর এই চিঠির লেখা আর আরাফের হাতের লেখা যেন দিন আর রাতের মতো আলাদা, আকাশ-পাতাল তফাৎ! এখন তার মনে একটাই প্রশ্ন জাগছে,
——— "তাহলে এই অচেনা লেখক কে?"
কিন্তু হঠাৎ আঁখির পদযাত্রা স্তব্ধ হল। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ—বক্ষ উঁচু করে, দু'হাত পকেটে গুঁজে, কঠিন চোয়াল আঁকড়ে। তার কালো চোখের মনির পাশে সাদা অংশ রক্তিম বিষণ্ণতায় পরিপূর্ণ, বিদ্যুৎচমকের ন্যায় চঞ্চল দৃষ্টি আঁখির দিকে নিবদ্ধ। এমন বিভ্রমময় দৃশ্য দেখে আঁখির মনে বিস্ময় আর ক্ষোভ একযোগে উথলে উঠল। কেন সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে? আর এমন নির্বাক ভঙ্গিতে ভূতের মত কেন দেখছে? রাতের ঘোর অন্ধকারে এক ভৌতিক ছায়ামূর্তি, গ্রাস করে নেবে সমস্ত অস্তিত্ব! আঁখি পাশ কাটিয়ে এগোনোর চেষ্টা করলে, মুগ্ধর কণ্ঠ গভীর, ধ্রুপদী সুরের মতো কেঁপে উঠল,
——— "এক পা ও সরবে না!"
আঁখি ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
——— "এখন তবে কি, আপনার কথামতো পা ফেলতে হবে?"
কিন্তু তারপরেই নিশ্চুপ হলো, বাক্যে আর কোন বিরোধ তুলল না, মুহূর্তের মধ্যেই তার বিক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে গেল মুগ্ধকে দেখে। মুগ্ধর মুখমণ্ডল ক্রমেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে, কপালের বিশৃঙ্খল কেশপুঞ্জের মাঝে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল ফুলে থাকা রগের বিভীষিকা। অদ্ভুত দৃষ্টি আঁখির ওপর নিবদ্ধ, কঠিন, অপ্রতিরোধ্য। রাগের সেই গম্ভীর সৌন্দর্য যেন মুগ্ধকে আরও অমোঘ করে তুলেছে; ক্ষুদ্র বিরোধের মর্মে ফুটে উঠেছে ছেলেদের ক্রো'ধে তাদের মূর্তিমান ঐশ্বর্যের প্রকাশ। মুগ্ধর এ ভয়ংকর রাগেও তার সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বেড়ে উঠেছে, প্রকৃতিতে এমন পুরুষের রুদ্রমূর্তির সৌন্দর্যই শাশ্বত, ভয়ংকর অথচ মোহনীয়।
আঁখি হতবাক, চোখে তার অনিশ্চয়তার ছায়া, এ কী বিচার! কেনই বা মুগ্ধ এমন তীব্র ক্রো'ধ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে?
আঁখি বিরক্তির সুরে বলল,
——— "আপনি এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন?"
মুগ্ধ যেন নিরুত্তর পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে, সামনে থাকা ক্ষুদ্র চুনোপুঁটিকে ছিন্নভিন্ন করতে উদ্যত বাঘের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আঁখি আবারও বলল,
——— "ষাঁড়ের মতো কি দেখছেন?"
মুগ্ধের ঠোঁট থেকে একটিও শব্দ বেরোল না। আঁখি বিরক্ত হয়ে ফের বলল,
——— "আচ্ছা লোক তো আপনি! সরছেন না, যেতেও দিচ্ছেন না, আর কিছু বলছেনও না! শুধু গম্ভীর রাগী ষাঁড়ের মতো তাকিয়ে আছেন! আপনার জন্য 'রাগী ষাঁড় মশাই' নামটাই একেবারে ঠিক! হুহ!"
মুগ্ধ তার কথার কোনো জবাব দিল না, বরং তার কঠিন চোয়াল শক্ত রেখেই চোখ রেখে দিল আঁখির হালকা গোলাপি রঙা ঠোঁটের ওপর; যে ওষ্ঠদ্বয় দিয়ে এই বিদ্রুপের তির ছুটে এল। অন্তরে যেন এক দমকা প্রলয়ধ্বনি বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাহিরে সেই ঝড়ের চিহ্ন নেই।
আঁখি হঠাৎ থেমে গেল। মনের ভেতরে যেন উথালপাথাল হতে লাগল বিরক্তির তরঙ্গ, মেজাজ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এই লোক কি তাকে পাগল ভাবছে? এমন নির্লিপ্ততা আর অদ্ভুত নীরবতা! রাতের বেলায় এভাবে ভূতের মতো আচরণ! আঁখির মনে আকস্মিক একটা শঙ্কার ঢেউ বইল, বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,
——— "এই... আপনাকে কি জ্বীন ধরে নি তো, ষাঁড় মশাই?"
মুখ চেপে হেসে বলল আঁখি! কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
——— "আপনি থাকুন আপনার নিরবতা নিয়ে। আমি যাচ্ছি! আপনার এই নীরবতা দেখার ইচ্ছা আমার নেই!"
এতটুকু বলেই আঁখি পা বাড়ানোর আগেই মুগ্ধর কণ্ঠ যেন আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো ভেসে এলো—রাশভারি, গভীর, ভূতুরে ভয়ালতায় আচ্ছন্ন কন্ঠস্বর,
——— "কেন এমন করেছো...??"
দমকা বাতাস আঁখির গায়ে ছুঁয়ে গেলো। সেই সঙ্গে মুগ্ধর ভূতুরে উপস্থিতি, ভয়াবহ কণ্ঠের গভীরতা, সবকিছু মিলিয়ে আঁখির চারপাশের পরিবেশ যেন কোনও অদৃশ্য রহস্যের আবরণে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। অথচ আঁখির মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল, কৌতুকের সুরে বলল,
——— "কি করেছি আমি?"
মুগ্ধ, উঁচু খাম্বার মতো লম্বা বলিষ্ঠ সেই দেহ, হঠাৎই আঁখির দিকে ঝুঁকে এল। যেন এক বিশাল পাহাড় নত হয়ে পড়েছে। হাটুতে হাত রেখে সেই শক্তিশালী পুরুষ তার মুখকে আঁখির মুখোমুখি আনল। আঁখির কপালের ভাঁজ গভীর হলো, মনে মনে প্রশ্ন উথলালো—এই লোকটা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন?
মুগ্ধর সূক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবার আঁখির সরাসরি সামনে। শ্বাসের নিঃসরণ যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে। মুগ্ধ সেই গম্ভীর, নিচু কণ্ঠে বলল,
——— "কেন করেছো এমন?"
আঁখি উদাসীন সুরে বলল,
——— "বলবেন কী করেছি?"
——— "বোকা নও তুমি!"
——— "এই জীবনে অসংখ্য কাজ করেছি, করছি, প্রতিটি মুহূর্তে! কীভাবে বুঝব আপনি কোন কাজের কথা বলছেন?"
মুগ্ধর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল,
——— "আমি দেখছি।"
আঁখি বিরক্তির চূড়ায় উঠে বলল,
——— "উফফ, তখন থেকেই তো জিজ্ঞেস করছি, কী দেখছেন?"
মুগ্ধর কণ্ঠ যেন রাতের বুকে ঝড় তোলার মতো কর্কশ হয়ে উঠল,
——— "পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণীটিকে!"
আঁখির ঠোঁটের কোণে উদ্ভাসিত এক অদ্ভুত হাসি! যার সুরাহা করা দুরূহ। সে বলল,
——— "হায়! অবশেষে চিনতে পারলেন তবে? মানতে হবে যে আপনার দৃষ্টি অন্ধ নয়, অন্তত!"
এ বলেই সে অম্লানবদনে পাশ কাটিয়ে গেলো! মুগ্ধ শিরদাঁড়া সোজা করে স্থির দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু পেছনে আর ফিরে তাকালো না, সে নিজেকে এক অদেখা পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছে। এদিকে, রোহান দীর্ঘ সময় ধরে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে; তার মনের অন্তর্গত আগুন যেনো দহন করছে প্রতিটি স্নায়ুকে! দুজন মিলে প্রেমের নিগূঢ় রসাস্বাদন করছে? অথচ তাকে বলেছিলো তার মনে ভালোবাসা নেই! তবে এ সমস্ত কি?
রোহান লুঙ্গির প্রান্তটিকে মুঠোয় চেপে ধরল, বুকটি অহঙ্কারে স্ফীত করে মুগ্ধর পাশে এসে দাঁড়ালো। এক অমোঘ সংকল্পের মতো কঠোর ছিল তার দেহভঙ্গি, আর তার চোখে জ্বলে উঠেছিলো এক অপ্রকাশিত দুষ্টুমি! রোহান গলা খাকারি দিয়ে কটাক্ষের সুরে বলল,
——— "মুখে এক, মনে আরেক? হুহ!"
মুগ্ধর মুখে কোনো উত্তর আসলো না। তার ভেতরের তপ্ত রাগ যেনো মসৃণভাবে ফুটে উঠছে, তবু সে কথা না বলে পা চালালো অন্যদিকে। সে জানে, এখন কথা বললে রোহান তাকে ছেড়ে দেবে না, আর এই মুহূর্তে কোনো বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছা তার নেই। মাথার ভেতর রাগ দাউদাউ করে জ্বলন্ত, কিন্তু অকারণে রোহানকে মা'রার ইচ্ছে সে পোষণ করছে না।
মুগ্ধর এমন নির্লিপ্ত বিদায় দেখে রোহান তার পিছু হাঁটতে লাগল, আর কটূক্তির ছুরিটি ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
——— "শা'লা! এখনই পালাস কেন?"
মুগ্ধ থমথমে কণ্ঠে উত্তর দিলো, একটুও পিছন না ফিরে,
——— "আমি চাই না তুই আমার হাতে মা'র খাস, তাই তোকে বাঁচানোর জন্যই চলে যাচ্ছি!"
রোহান কটাক্ষের ধারালো সুরে বলল,
——— "এহহহ! আসছে মা'রবে! স্বীকার কর তুই ভয় পাচ্ছিস! শোন, তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।"
মুগ্ধ হঠাৎ দাঁড়ালো, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
——— "যা বলার বল! সময় পাচ মিনিট! আর এক মুহূর্তও বেশি নয়!"
রোহান মনেমনে ফুঁসতে লাগল, নিজের সঙ্গে আপাত জবাববিহীন বিতর্কে,
——— "পাচ মিনিট? আহা! যখন পিচ্চিটার সাথে থাকে, তখন তো এসময় জ্ঞান সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়! এখন কি করে সেই সময়ের মাপদণ্ডে টান দেয়?"
তবে রোহানের উপস্থিতি কোনো তুচ্ছ বিনিময়ের জন্য নয়। সে এসেছে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে, তার নিজের ভাষ্যমতেই। তবে সরাসরি তা উগড়ে দিলে মুগ্ধ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, এমনকি নিকটবর্তী ঘাসও মাড়িয়ে রাখবে তার আক্রোশে! তাই অন্য কোনো মোড়ক দিয়ে এই কথার সূচনা করতে হবে, এবং সেটা একরকম সূক্ষ্ম ছলনার মাধ্যমে।
একটা বিদ্রূপের রেশ তুলে, রোহান নিজের ভাবনা পরিশীলিত করল এবং একটু গুরুগম্ভীর মুদ্রা ধারণ করে সে এক নিশ্বাসে বলল,
——— "তুই সেদিন আমায় বলেছিলি, তুই যাকে ভালোবাসিস, সে তখন ছোট ছিল, তাই বিয়ে করতে পারিস নি! এখন সে বড় হয়েছে, তাই বিয়ে করবি! তাকে হালালভাবে চাচ্ছিস! এও বলেছিস, সে তোর অন্তরে থাকে, কিন্তু সে তোকে কোনোদিন বিয়ে করতে চাইবে না! তবুও তুই তাকে চাইছিস! এখন তুই নিজেই বলেছিস, তুই পূর্বিকাকে ভালোবাসিস না! তোর সব কথার ছাপে একটাই নাম আসে— আঁখি! সে শত্রু পক্ষের মেয়ে হলেও, তোর জন্য তাকে তুলে আনতে আমরা তৈরি। কিন্তু তুই ওর সাথে প্রেম করছিস, মানে জালাচ্ছিস! পথ আটকে কথা বলছিস, ওড়নাও ছিঁড়ে দিচ্ছিস! আর কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খেয়ে গোসল তো করেছিসই, ঠোঁট পর্যন্ত কেটে এসেছিস! তাই, হুজুর, আমার প্রশ্ন; তুই এত কিছু করেও কেন অস্বীকার করছিস? আর কেন বলেছিলি তোর মনে বিষ আছে? এবার বল! এবার বল!"
রোহান দীর্ঘ কথার পর এক গভীর শ্বাস নিলো, যেন নিজের ভাষার ভার লাঘব করল। ঠোঁটের কোণে হাসির সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল। সে এখন অধীর অপেক্ষায় আছে, দেখতে চায় মুগ্ধ কীভাবে এই প্রশ্নের বোঝা বইবে। সে নিশ্চিত যে, আজ সবদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেছে, কোনো পালানোর পথ নেই।
মুগ্ধ ঠোঁট বাঁকিয়ে এক ধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।। তারপর স্থির, গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
——— "ভালোবাসা? বি'ষ ছাড়া কিছু নয়, ধীরে ধীরে অন্তরকে পুড়িয়ে ফেলে। যে সত্তা ছিল, সে মৃ'ত। তোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এখনকার সত্তা—মৃ'ত্যুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু আমার পথ এখনও অসমাপ্ত। কাজ শেষ হলে তবেই শেষ হবে আমার গল্প।"
রোহানের র'ক্ত তখন মাথায় উঠে গেছে। এতগুলো সরল যুক্তির উত্তর হিসেবে এমন তুচ্ছ, অবান্তর কথা! সে বুঝল, মুগ্ধ তার মুখ থেকে সত্য স্বিকার করবে না। কিন্তু রোহান যা বলার জন্য সে এসেছে, তা বলতে আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার কথা সরাসরি। মুগ্ধর বাঁকা হাসি যেন চোখে বিঁধল, মনে মনে মুগ্ধ বলল,
——— "তুই কেবল ততটুকুই জানিস, যতটুকু আমি তোকে জানাতে চেয়েছি। তুই ভাবছিস যা আমি তোকে ভাবাতে চেয়েছি। কীই বা করবি, বোকা ছেলে! সত্য থেকে তুই কত দূরে আছিস, তা তোর বোধের সীমার বাইরে।"
রোহান তির্যক হাস্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
——— "আহা মধু, এই যে এত বল প্রয়োগ! এত ঘুষাঘুষি করেও কি কোনো ফল হলো? কামড়ের প্রতিদান কি কামড়ে দিতে পারলি না?"
রোহান আঁখির কথাই তুলছে! সে পুরোটা সময় লুকিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে, অবশ্য দৃষ্টিতে কোনো কু-উদ্দেশ্য ছিল না! শুধু এটাই নিশ্চিত হতে চেয়েছিল যে মুগ্ধর মতো আঁখির ঠোঁট কেটেছে কি না। কিন্তু হতাশ হলো, কারণ তেমন কোনো দাগ দেখতে পেল না! তার শক্তিধর বন্ধু এ কাজটাও করে উঠতে পারল না! আহা, রোহান মুচকি হাসিতে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে আছে। অপরদিকে, মুগ্ধর দৃষ্টি নির্বিকার, সংবেদনশূন্য। রোহানের কথার ইঙ্গিত সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। তার হাত কিলবিল করছে আরও একবার শক্ত থাপ্পড় বসাতে, কিন্তু সে স্থির। আচমকা ফোনের রিং বাজল। নাম্বারটি দেখে সে এক পা পেছিয়ে রোহানের থেকে দূরে গিয়ে ফোনটি কানে ঠেকাল। অপরপ্রান্ত থেকে কী বলা হলো তা বোঝা গেল না। মুগ্ধ শুধু শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু দৃঢ়তায় গর্জে উঠল,
——— "ওকে দেখামাত্রই গু'লি করবে! আমি আসছি!"
উচ্চারিত শব্দের ভারে কালিমা না ছড়িয়ে, মুগ্ধ নীরবতার আচ্ছাদনে বাইকের পাশে গমন করল। তার হাতের শিরা টান টান, অঙ্গুলি বাইকের স্টার্টারে স্পর্শ মাত্রেই ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেলো। যাওয়ার পূর্বে, সেই অচঞ্চল নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই, রোহানের দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলল,
——— "মা’কে জানিয়ে দিস, আমি জরুরি কাজে গিয়েছি।"
তারপর এক অনির্দেশ্য দ্রুততায় ধূলিকণার ঘূর্ণিতে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে, নিশিথরাত্রির আঁধারে অপার গতিতে, চোয়াল শক্ত করে বাইকটিকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো বোধকরি। মুহূর্তের মাঝেই, কৃত্রিম আলোকিত পৃথিবীকে পেছনে ফেলে, সে কালো আকাশের অন্তরালে হারিয়ে গেল।
রোহান স্তব্ধ হয়ে রইল, চোখে বিষ্ময়। এই গভীর রাতে মুগ্ধর জন্য কোন কাজ অপেক্ষা করছে? মাত্র কয়েক মুহূর্তেই তো মধ্যরাত্রির বারোটা ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে!