লেখিকাঃ সাবিহা জান্নাত
পর্বঃ ০৫
বিভোরের কথায় শ্রুতি তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠে,,,
~ ইগনোর করছি। আপনাকে তো মনেই রাখিনি তাহলে ইগনোর কেন করবো। যে মনেই নেই তার প্রতি কিসের অনুভূতি।
শ্রুতির কথা শুনে বিভোর তার হাত আরো জোরে চেপে ধরে। শ্রুতি দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করে যাচ্ছে। মুখে তার বিন্দুমাত্র আর্তনাদে ছাপ নেই। সে নিজেকে বিভোরের সামনে আর দুর্বল প্রমাণ করতে চায় না।
~ আমাকে ছাড়া তো বিন্দুমাত্র সময় কাটতো না তোমার । আগে তো খুব ভালোবাসতে আমাকে তাহলে এখন সমস্যা কোথায় ? কেন এভাবে এড়িয়ে চলছো।
বিভোরের রাগান্বিত হয়ে করা প্রশ্নে শ্রুতির অবস্থার বিন্দুমাত্র অবনতি হয় না ।শ্রুতি বিভোরের রক্তিম বর্ন ধারন করা চোখের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেগে কড়া গলায় বলে উঠে,,,
~ আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আগের শ্রুতি আর সেই শ্রুতি নেই। অনেক টায় বদলে গেছে সে। যার চোখে অল্পতেই জল বেরিয়ে আসতো ,
যে অল্পতেই খুব ভয় পেয়ে যেত, যার সাথে চলার জন্য কেউ না কেউ সঙ্গী হতো সেই শ্রুতি আর সেই শ্রুতি নেই।
আর বলছেন আমার বদলে যাওয়ার কথা । বদলে যেতে বাধ্য হয়েছি।সবাই আমাকে বদলে যেতে বাধ্য করেছে । কেননা যে শ্রুতির সামান্য চোখের পানিতেও সবাই বিচলিত হয়ে যেত,
তার কষ্টে সবার বুকটা ফেটে যেতে, চলার সময় হোঁচট খেলে হাত টা ধরার অনেক মানুষই ছিল।
একটা সময় পর সেই শ্রুতির জন্য কারো চোখের জল ঝরতো না, তখন তারাই আমার চোখের জল ঝরিয়েছে। তার প্রচন্ড কষ্টের সময় ও তাকে কষ্ট দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
হোঁচট গেলে হাত টা বাড়িয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না, তখন নিজেকে বদলে নেওয়ার চেষ্টা করেছি ।যেন পড়ে গেলে কারো সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়াতে পারি।
বাবার অনুপস্থিতিতে যখন সবাই পর করে রেখেছিল সেদিন ই বুঝতে পেরেছিলাম বাবা যতদিন ছিল মাথার উপর ছাদ ছিল। আজ বাবা নেই সেই জন্য আপন বলতেও কেউ নেই। নিজের পথ কে নিজেই চলতে হবে। তখন উঠে দাঁড়াতে আমি বাধ্য হয়েছি ।
শেষের গুলো বলতে গিয়ে শ্রুতির চোখের কোণে পানি, আর গলায় কথা আটকে যায়। সে আর কোনো কথা না বলে বিভোরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চুপচাপ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।
বিভোর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শ্রুতির হাতটা ছেড়ে দিয়ে শ্রুতির কোমড়ে হাত রেখে অন্য হাত দিয়ে শ্রুতির চোখের পানি গুলো আলতোভাবে মুছে দেয়।
খুব বেশি কঠোর হলেও মনটা তার বেশ কোমল রয়েছে এখনো। ঐরকম পরিস্থিতি থেকে উঠে আসা এতোটাও সহজ ছিল না তার পক্ষে।
তবে শ্রুতি উঠে আসতে পেরেছিল। তাকে বাধ্য করেছিল পরিস্থিতি। অল্প বয়সী রেখে চলে যাওয়া বাবা হীন সন্তান বুঝেছিল আপন মানুষদের কাছে তারা কতটা বোঝা। অথচ বাবা তাকে কখনো বুঝতে দেয়নি কষ্ট কি।
কখনো চোখের কোণে জমতে দেয়নি পানি। বাবার রাজ্য হীন পৃথিবীতে মেয়েকে আগলে রেখেছিল রাজকন্যা স্বরুপ।
সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিল তাঁকে। দ্বিতীয় মা হিসেবে পেয়েছিল তার বাবা তাকে। তার বাবার কাছে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সবচেয়ে বড় গিফট ছিল শ্রুতি।
তাকে কখনো কষ্ট দেওয়া তো দূরের কথা । তাকে সযত্নে তুলে রেখেছিল মনের মনিকোঠায়। অথচ তার বাবার মৃত্যুর পর নিষ্ঠুর পৃথিবী তার সমস্ত সুখ শান্তি সহ্য করতে পারেনি।
তার বাবার মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হলো। উপাধী দেওয়া হলো অপয়া । যার ঘরে এমন মেয়ে থাকবে তার বাবার নাকি মৃত্যু ছাড়া উপায় নেই।
পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষ গুলো তাকে নিষ্ঠুর ভাবে কষ্ট দিতে শুরু করলো। চলে যাওয়া বাবার প্রতি শোক, রেখে যাওয়া মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব। প্রিয়জনের দেওয়া অবহেলা।
সম্পর্কের শেষ পরিনতি সবকিছুর ই স্বাদ সেই মেয়েটি গ্রহন করেছিল অবলীলায়। বারবার সুইসাইড করতে গিয়েও মা আর ভাইয়ের কথা ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। অবশেষে এইসব কিছুর চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে বাঁচবার চেষ্টা। নতুন করে নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়া।
সবকিছুর অবশান ঘটিয়ে আজ যখন সে নিজেকে সুখি করার চেষ্টা করলো ভাগ্য তখন বুঝিয়ে দিল ভেঙ্গে যাওয়া মনটা কাঁচের টুকরোর ন্যায় জোড়া লাগানো সম্ভব নয়।
মনের মাঝে কোথাও একটা আক্ষেপ থেকে চায় প্রতিটি মানুষের চাওয়া পাওয়া গুলোর পূর্ণতা পেলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত পৃথিবীর।
আজ সব কিছু স্বাভাবিক। বাবার অনুপস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, প্রিয় মানুষের ফিরে আসা। তাহলে তাকে গ্রহণ করতে সমস্যা কি। সবকিছু পাওয়া সত্ত্বেও আজ পেতে কেন ইচ্ছে করছে না। তাহলে কি অপূর্ণতার স্বাদ সে গ্রহণ করেই সে ক্ষান্ত।
ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ে না পাওয়ার আক্ষেপ নেই। হৃদয়ের ক্ষত কি এখনো শুকায় নি তার ।সে চাইলেই পূর্ণতা পাবে তবুও তার পূর্ণতার স্বাদ গ্রহনের ইচ্ছে নেই কি।
বিভোর শ্রুতির হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বিনীতভাবে বলে উঠে,,
~ প্রিজ আমি হাতজোড় করছি তোমার । আমাকে ফিরিয়ে দিও না। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যাবো না ।
প্লিজ, প্লিজ আমাকে একবার সুযোগ দাও। আমি সবকিছু শুধরে নিবো।প্লিজ তুমি আমার আগের শ্রুতি হয়ে ফিরে আসো আমার লাইফে।
বিভোরের কথায় যেকেউ বরফের ন্যায় গলে যাবার উপক্রম।তার এতোবার করে হাতজোড় করার পর ও শ্রুতির মন গলে নি। তার আঘাত টা লেগেছিল হৃদয়ের খুব গভীরে। যার ক্ষত বিক্ষতের চিহ্ন এখনো রয়েছে। সে ঘা শুকায়নি তার।
বিভোরের কথায় শ্রুতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিতে,,
~ কাক কখনো দ্বিতীয় বার জোড়া বাঁধে না কেন জানেন, কাক একমাত্র প্রাণী যে কিনা সঙ্গী হারানোর শোক কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারেনা ।
সেই সাথে কাক এটাও জানে দ্বিতীয় বার যে আসে সে কখনো ভালোবেসে আসে না , বিপদে পড়েই আসে ।আর সেখানে সবকিছু থাকলেও ভালোবাসা থাকে না ।
আশা করি কথাটা বুঝতে পারছেন আর বোঝানোর প্রয়োজন নেই। আপনার যদি কথা শেষ হয়ে থাকে, আপনি চলে যেতে পারেন।আর হ্যা আপনি আমার আশা ছেড়ে দিন।
কারন এই জীবন থাকতে শ্রুতি কখনোই মন থেকে আপনাকে চাইবে না। আপনি অন্য জন কে খুঁজে নিলে ভালো হয় আপনার জন্য। তবুও আপনার ইচ্ছা আপনি কি করবেন না করবেন।
শ্রুতির কথায় বিভোর তার হাত ছেড়ে দেয়। তার মুখে মলিনতার ছাপ। সে বুঝতে পারছে অভিমান করলে তার অভিমান ভাঙ্গানো যায় কিন্তু যে নিরব পাথরে পরিণত হয় তাকে কখনো ফেরানো যায় না।
বিভোর শ্রুতির হাত ছেড়ে দিয়ে নিরবে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কারো সাথে কোনো কথা না বলেই নিজের বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। বাসার ভিতরে গিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে যায়।
বিভোর শ্রুতির কথাগুলো শোনার পর নিজেই চুপ হয়ে গেছে।তার মাঝে নিরবতায় ভরপুর। তার কোনো কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না , মনে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো অভিমান।
তার অনুভূতি গুলো পাথরের ন্যায় ধারন করেছে।তার কারো সাথে মিশতে ইচ্ছে করছে না । কারো সঙ্গ পেতে ইচ্ছে করছে না । সে নিজকে একাকিত্বে বন্দি করে রাখতে চাইছে।
এই কয়েদিনে বিভোর নিজেকে একা ঘরে বন্দি করে রেখেছে।কারো সাথে কোনো কথা বলছে না। বন্ধুদের সাথে কোনো দেখা নেই , আড্ডা নেই । সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে একা রাখার চেষ্টায় সে ।
ভাবছে না শ্রুতির কথা ।পাবে না তাকে জেনে তার অনুভূতি গুলো কবর দিয়ে দিয়েছে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এক তরফা ভালোবাসা থেকে।
শ্রুতির সাথে দেখা হলেও তার দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে না বিভোরের। তাকে আর নতুন করে খুঁজে পাবার ইচ্ছে নেই। অবশ্য এই সবকিছু বিভোর মনের বিরুদ্ধে গিয়েই করছে।
নিজের মনের কথায় সায় দিলে কখনো সে শ্রুতি কে ভুলতে পারবে না। শ্রুতিকে ভোলার জন্য হলেও এসব করতে হচ্ছে তাকে। যদিও মনে যে গেঁথে যায় তাকে কখনো ভোলা যায় না।
তবে বিভোরের এমন পরিবর্তন শ্রুতিকে একটুও বিচলিত করে নি। সে কখনো ভাবেনি তাকে নিয়ে। যে মানুষ টি তাকে ভালোবাসে প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে তার মনের অবস্থা সম্পর্কে সে কখনো খোঁজ খবর নেয়নি।
এই কয়েক দিনে তার সাথে কথা বলার জন্য পাগলের মতো ছোটাছুটি করা ছেলেটার দেখা নেই কেন? এসব প্রশ্ন কখনো শ্রুতি কে ভাবায়নি। ভাবিয়েছে কিনা সেটা হয়তো শ্রুতি ই শুধু জানে। সে প্রকাশ করতে চায় না, নাকি সত্যি বিভোরের প্রতি ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলেছে।
0 Comments