লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার
দু'বন্ধু ড্রেসিং রুমে যেয়ে রেডি হতে হতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো শেষ আরেকবার নিজেরা আলোচনা করে। আলভি সুপ্ত দু'জনেরই কফি কমন ফেভারিট কালার হওয়ায় একই কালারের কোট প্যান্টের সেট পরিধান করলো। একজন স্টাফ এসে তাদের কে কনফারেন্স রুমে নিয়ে যায়।
কনফারেন্স রুম।
বিশেষ উপলক্ষে ভিন্ন পরিবেশে সাজানো হয়েছে সবকিছু। শীততাপনিয়ন্ত্রিত রুমের ঠিক মধ্যখানে লম্বা টেবিল, এর চারপাশে সারিবদ্ধ কারুকার্য খচিত চেয়ার। একপার্শ্বে জনকয়েক স্টাফ ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। মৃদ্যু আলোক শোভা, সুগন্ধিতে ভরপুর সম্পূর্ণ কক্ষ। আলভি, সুপ্ত প্রবেশ করতে সকলে হাত তালি দিয়ে স্বাগত জানায়। তারা নিজেদের আসন গ্রহণ করে এবং সবাইকে বসতে অনুরোধ করে।
মি. আফতাব মাইক হাতে সবাই কে অভিবাদন জানিয়ে বলেন " হি ইজ মাই বি লাভড সান আলভিয়ান আভি... এন্ড.... হি ইজ মাই ক্লোজ ফ্রেন্ড'স সান শাহরিয়ার সুপ্ত.... কংগ্রাচুলেশনস টু বোথ অফ ইউ ফর কামিং টু আওয়ার ইভেন্ট!!...."
ওরাও হাসি মুখে সবাই কে অভিবাদন জানায়।
একজন স্টাফ এসে অ্যালকোহল'র গ্লাস এগিয়ে দিলে আলভি চকিত হয়ে স্টাফের দিকে তাকায় নিচু কন্ঠে বলে "অ্যালকোহল!!..... সব সময়-ই এমন হয়?!...."
মাথা নিচু করে ছেলেটি বলে " জ্বি স্যার!!"
: চা কফি থাকলে দাও... এগুলো নিয়ে যাও....
: ওকে স্যার!!....
এবার মি. ফারহান মাইক নিজের দিকে নিয়ে বলেন, " ইউ অল আর নো... দ্যাট... আওয়ার সান'স ওয়ার আউট অফ দ্যা কান্ট্রি টু কমপ্লিট দেয়ার গ্রাজুয়েশন..... আলভি এন্ড সুপ্ত!!.... আর নাও দ্যা নিউ সিইও'স অফ আওয়ার কম্পানি'স!!!......."
সকলে সমস্বরে করতালি দিলেও আলভি ভ্রু কোচকে তাকায় ওর আংকেলের দিকে। বোঝার চেষ্টা করে আসলে কি হতে যাচ্ছে এই সভায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরুশা হক'কে দেয়া কথা রক্ষার্থে সে ফিরে এসেছে নিজের দায়িত্ব বুঝে নিতে। গম্ভীর হয়ে আলভি নানা কথা ভাবছিলো এমন সময় আরেকজন স্টাফ এসে ওর আর সুপ্ত'র সামনে কিছু পেপার দেয় সাইন করার জন্য।
আলভি'র চেহারায় চিন্তার ভাব খেয়াল করে চাপা কন্ঠে সুপ্ত জানতে চায় " আলভি!!.... আর ইউ ওকে?!...."
: আমাদের কোম্পানি হঠাৎ সেপারেট হচ্ছে কেন?!!....
: হয়ত... তুই আমি ফিরে এসেছি তাই...
: হাহ!... তোকে আমার কমপিটিটর করা হচ্ছে!!...
: এসব কি বলছিস!!... আমাদের বাবা'রা কি কমপিটিটর ছিলেন!!....
: যাহ!... সাইন করে দিলাম!.... তুইও দে!....
সুপ্ত কিছু বলতে যাবে আলভি চোখের ইশারায় থামিয়ে দেয়। ওরা এভাবে চাপা কন্ঠে কথা বললেও বিষয় টা সকলেই লক্ষ্য করে এজন্য মি. ফারহান জিজ্ঞেস করেন " তোমরা কি কোন বিষয়ে কনফিউজড?!.... "
: বাবা!!... একচুয়্যালি... আফতাব আরুশা কোং আর ফারহান এগ্রো প্রায় ত্রিশ বছর জয়েন্ট ভেনচারস ছিলো... তাহলে....
মৃদ্যু হেসে মি. ফারহান বলেন " লিসেন মাই সান!...দ্যাট ওয়াজ আওয়ার ইস্যুজ... বাট নাউ উই ওয়ান্ট....ইউজ ইউর স্কিল'স ইনডিপেনডেন্টলি....."
মি. আফতাবও তাঁর সাথে সহমত পোষণ করেন।
সুপ্ত আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু মি. ফারহান তাকে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলেন, অসহায় ভংগিতে সুপ্ত আলভি'র দিকে তাকালে আলভি স্মীত হেসে আস্বস্ত করে।
মি. আফতাব এবার ফায়সাল এগ্রো লিমিটেড এর মালিক মি. ফায়সাল খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন আলভি এবং সুপ্ত'কে। আলভি একবার আড় চোখে তাকায় ফারাবি খানের দিকে সে হাস্যজ্বল চেহারায় তার বাবা'র পাশে বসা। যেহেতু ফারহান এগ্রো আজকে থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে তাই বিজনেসের প্রয়োজনে ফায়সাল এগ্রো'র সাথে দশ বছর মেয়াদি চুক্তির প্রস্তবনা রাখা হয়। মি. আফতাব আরো জানান তিনি ফারাবি খানের সাথে তার একমাত্র কন্যার শীঘ্রই এনগেজমেন্ট করাবেন। আলভি'র সামনে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য আরেকটি ফাইল দেয়া হয়।
এতক্ষণ আলভি স্থিরদৃষ্টি নিয়ে একদম গম্ভীর হয়ে সবার কথা শুনছিলো। প্রচন্ড রাগে তার কপালের প্রতিটা শীরা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, নিজেকে সংযত করে এবার সে উঠে দাঁড়ায় শক্ত গলায় বলে
" আ'ম আলভিয়ান আভি!.... ইলডার সান অব মিসেস আরুশা হক..... কারেন্ট সিইও অব আফতাব আরুশা কোং... দ্যাট'স হুয়াই....কোন কোম্পানির সাথে... কত বছর মেয়াদি ডিল হবে সেটা আমি ভেবে জানাবো....তবে এখন কোন ডিল হচ্ছে না ফায়সাল এগ্রো'র সাথে.... বিশেষ ভাবে আমার বোন কে বিজনেসে'র জন্য ব্যবহৃত হতে দিতে পারি না!!!......" বলে সোজা বেরিয়ে যায় আলভি কনফারেন্স রুম থেকে।
আলভি'র এমন কান্ডে সবাই থ' হয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মি. আফতাব ধরা গলায় সবাই কে বসতে বলে তিনিও বেরিয়ে যান। সুপ্তও এক মুহুর্ত দেরি না করে এক প্রকার দৌড়ে বেরিয়ে যায়। মি. ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলে মৃদ্যু থাবা দেন, চেহারায় তার স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ, বুঝতে পারেন আজকে আর কোন ভাবেই আলভি ফিরবে না এই রুমে, ছেলে টা অবিকল মায়ের চিন্তাভাবনা কে লালন করে। সবাই কে এমন ঘটনার জন্য দুখ প্রকাশ করে অপেক্ষা করতে বলেন মি. আফতাবের ফিরে আসার জন্য।
অন্যদিকে আলভি আরুশা হকের কেবিন যেটা বর্তমানে তার জন্য বরাদ্দ সেখানে চলে আসে। অসহ্য অস্থিরতায় কোট খুলে ছুড়ে ফেলে একদিকে, এসি'র পাওয়ার অনেক কমিয়ে দেয়, এরপরেও ঘেমে ভিজে যায় আলভি। তার ইচ্ছে হচ্ছে সব কিছু ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। অনিয়ন্ত্রিত রাগ সামলাতে না পেরে বার কয়েক দেয়ালে ঘুষিও দিয়ে ফেলে, কেটে যায় বা' হাত, গলগলিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত। পাথরের মত দাঁড়িয়ে যায় আলভি নির্বাক চোখ থেকে গড়িয়ে পরছে অশ্রুধারা। মি.আফতাব ছেলের এই অস্থিরতা সবই দেখছেন কেবিনের বাইরে থেকে কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সাহস হয় না তার।
সুপ্ত হাফাতে হাফাতে ছুটে আসে আলভি কে এই অবস্থায় দেখে দ্রুত ভিতরে যায় " আলভি!!.... ভাই আমার!!...." বলে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে আলভি কে।
আলভি যেন অনুভূতিহীন হয়ে গেছে সুপ্ত কে দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সরে দাঁড়ায়। সুপ্ত ফাস্ট-এইড বক্স এনে আলভি'র হাতে গজ পেচিয়ে দিতে চাইলে বাধা দিয়ে নিজেই করে নেয়।
সুপ্ত আলভিকে ঝাকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলে " আলভি!.... আলভি! তুই আমাকে ইগনোর করছিস!!...."
: হাহ!.... সাইন করেছিস তো... আজ থেকে আমাদের স্বপ্নও আলাদা!....... আমারা কি এই প্রমিস করেছিলাম?!....
: ট্রাস্ট মি!!.... আমি কিচ্ছু জানতাম না!!.. আর কোম্পানি আলাদা হলে কিই বা হয়েছে?!!.... তুই আমি কি আলাদা হচ্ছি??!!!.....
: সিরিয়াসলি সুপ্ত!!.... তুই এতো টা স্টুপিড!.... হাহ!!.... আগে তো জানতাম না.... মার্কেটিং বুঝিস?!!.... তখন ইনডিরেক্টলি তোর আর আমার কমপিটিশান শুরু হবে!!..... দু মিনিট ও লাগবে না এই ফ্রেন্ডশিপ শেষ হতে!!.....
: ইয়াহ!!.... অভিয়াসলি ইউ আর রাইট!!.... বাট রিমেম্বার.. আ'ম আলসো সিইও অফ ফারহান এগ্রো!!.....
: সো হুয়াট?!...
: সো ইফ উই ওয়ান্ট.... উই ক্যান এগেইন জয়েন্ট আওয়ার বিজনেস!!!
: হাহাহাহাহ!......
: এভাবে পাগলের মতো হাসছিস কেন?...
: এই বিজনেসের সেভেন্টি পারসেন্ট এর মালিক আমি..... আম্মি তার প্রপার্টি আমার নামে দিয়ে গেছিলো..... কিন্তু তোর?!..... মনেহয় না আংকেল কখনো এটা আর মানবেন!!!.....
: আমিও নিজের প্রপার্টি বুঝে নিবো!!....
: বাচ্চাদের মতো বলিস না!!.... কিছুতো আছে যে জন্য তোকে আর আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী করা হলো......
সুপ্ত আলভি'র কাধে হাত রেখে বলে " আলভি!!.... তুই শুধু আমার ভালো বন্ধু না.... আমার ভাইও....প্রমিস আমাকে সব সময় তোর পাশে পাবি!!...."
আলভি মুখে কিছুই বলে না মাথা নিচু করে শুধু স্মীত হাসি দেয়।
সুপ্ত আবার বলে " আচ্ছা সবাই তো ওয়েট করছে....."
: ডিসমিস করে দে.... যাবো না...
: ফায়সাল এগ্রো'র সাথে....
: ওদের কথা বলিস না এখন... জানিস!!... মি. আফতাব এই জন্য ডিল টা পাচ্ছেন কারণ উনি ওনার মেয়ে কে দিচ্ছেন তাই..... আমার বোন কি.....
: কাম ডাউন আলভি!!.... আমি আছিতো!!... এই ডিল হবে.... বাট তোর সাথে আমার!!!......
বিস্ময়ে আলভি সুপ্ত'র দিকে বলে " হুয়াট?!...."
: হাহাহা.... ইয়াহ!!.... ওয়েট!!.... আমি একটু কনফারেন্স রুম থেকে আসছি.....
: ওয়েট সুপ্ত!!....শোন!!....
: নো!!.... আমার ডিসিশান ফাইনাল!...
আলভি কে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সুপ্ত বেরিয়ে যায়। কনফারেন্স রুমে এসে সুপ্ত খেয়াল করে সবাই প্রায় বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। ধীর পায়ে নিজের চেয়ারে এসে বসে, মনে মনে একবার আওড়ালো কথাগুলো এরপরে মাইক এগিয়ে নিয়ে বলে " ফার্স্ট অফ অল উই আর এক্সট্রিমলি সরি ফর দিস সিচুয়েশন!.... অ্যাকচুয়েলি!... আজকে যা কিছু হলো এসবের জন্য আমরা দু'জনের কেউ প্রস্তুত ছিলাম না...... হঠাৎ শুনলাম আমাদের কোম্পানি সেপারেটেড হচ্ছে.... এমন কি এটাও শুনলাম ফায়সাল এগ্রো'র সাথে যে ডিল হবে সেটার মেইন রিজন হলো অনিতা মানে মি. আফতাব আংকেলের মেয়ের হাত.... সব মিলিয়ে আলভি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি......যাদের সাথে আজকে কথা হলো না নেক্সট ডেই আলভি মিটিং করে নেবে.......উম্মম্ম.... এজ আ'ম অলসো দ্যা সিইও অফ ফারহান এগ্রো... সো অলমোস্ট টেন ইয়ার'স এর এই ডিল আমি আফতাব আরুশা কোং এর সাথে করলাম......." বলে একটা পেপারে দুই কোম্পানির সিল দিয়ে একপার্শ্বে নিজের সাইন করে দেয়।
এবার যেন বিনা মেঘে দ্বিতীয় আঘাত লাগে মি. ফারহান আর মি. ফায়সালের মাথায়। মি. আফতাব তো এখনও বুঝতে পারছেন না কি হচ্ছে এসব।
মি. ফায়সাল খান তো রীতিমতো তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন তাকে অপমান করা হয়েছে এমন অনেক কিছু বলে চিল্লাচিল্লি শুরু করেন। সুপ্ত একবার ফারাবি'র দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে ক্রড় হেসে বেরিয়ে আসে কনফারেন্স রুম থেকে।
আলভি'র কেবিনে এসে দেখে সে ফোনের স্ক্রিনে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু খোজায় ব্যস্ত।
সুপ্ত একটু দুষ্টামি করে বলে " উম্মহ!.... স্যার ভিতরে আসবো?....
ফোনে চোখ রেখেই মুচকি হেসে আলভি বলে " নাহ!.... পরে এসো!!..."
: ওকেহ স্যার!.... আসলাম!!... বলে সুপ্ত ভিতরে ঢোকে
: হাহাহা.... পানিশমেন্ট হবে তোমার!
: ওমা তাই নাকি!.... কি পানিশমেন্ট?...
: দশ মিনিট দাড়িয়ে থাকো....
: আ... আহ!!... দশ মিনিট বসে থাকি চেয়ারে.....হাহাহা....
: কি অবস্থা ওই দিকের?!
: এই যে পেপার!....
: সিরিয়াসলি সুপ্ত??!....
: হুম্মম্ম.....
: আংকেল কি বললেন?...
: কিছুই না.... বললেই বা কি?!...
: উম্মম্মহ.... আমি ভেবে দেখবো এটা!....
: এজ ইউর উইশ!!.... আমি সাইন করে দিয়েছি!!.... আচ্ছা কি এত খুজছিস ফোনে?...
: কায়সার আংকেলের নাম্বার....পেলাম না.... আজকের মতো দিনে উনি আসলেন না কেন?!.....
: হয়ত জানেন না...
: অথবা জানতে দেয়া হচ্ছে না... উনি তো এমন করেন না!!....
: আচ্ছা... তাহলে উনার বাসায় যাবি... বলছি রাত তো হলো অনেক চল বাড়ি যাই.....
: হুম্মম্ম... চল....
আলভি সুপ্ত ওরা নিচে নেমে লক্ষ্য করে এখনো কয়েক টা গাড়ি পার্কিংলটে রাখা আছে। তারমানে কনফারেন্স রুমে হয়ত এখনো হট্টগোল থামেনি। সুপ্ত আলভি'র চোখাচোখি হতে হেসে দেয়।
কোলাহল বিহীন রাতের শহর। গাড়িতে বসে জানালার গ্লাস নামিয়ে দেয় আলভি। কালো আধারের মধ্যে অর্ধ চন্দ্র তার মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। শা শা শব্দে পাশ কাটিয়ে গেল দূরপাল্লার একটি বাস। শীতল বাতাসে ভেসে আসছে হাসনাহেনা ফুলের সুবাস। আলভি চোখ বুজে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়। হৃদয়ের না বলা আক্ষেপ অভিমান কমে যায় এমন নিরিবিলি প্রকৃতির ছোয়া পেলে।
: আলভি!.... এই আলভি!
: হুম্ম...
: আরে ওঠ!!... বাসায় পৌছে গেছি...
: হুমহ?!... ওহহো... আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম!!....
: হুম্ম... নাম এখন!....
সুপ্তি'র অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। গাড়ির হর্ণ শুনে পা টিপে টিপে নেমে আসে নিচতলায়। অস্থির হৃদয় যেন কোন এক মুগ্ধ মানবের প্রতিক্ষায় চোখে ঘুম আসতে দেয় নি। কলিং বেলের শব্দ হতেই ওর অস্থিরতা যেন কয়েক গুন বেড়ে যায়। লম্বা শ্বাস নিয়ে কাপা হাতে দরজা খোলে। সুপ্ত কিছুটা অবাক হয়ে বলে " কিরে!!... তুই!!.... ঘুমাস নি!..."
: উম্মহুমহ!.... মাথা নেড়ে জবাব দেয় সুপ্তি
: সুপ্ত!! তুই জানিস না পেচা রাত জাগে!.... বলে মৃদ্যু হেসে আলভি ভিতরে আসে।
সুপ্তি চাইলেও এই কথায় কোন রাগ দেখাতে পারেনা। সেও শুধু মুচকি হাসি দিয়ে তাকায় আলভি'র দিকে। হঠাৎ সুপ্তি আঁতকে ওঠে আলভি'র বা' হাতের ব্যান্ডেজ দেখে। এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আলভি বিরক্তি নিয়ে বলে " আরে ধুর!!.... গুড নাইট!!... আমি রুমে গেলাম......"
সুপ্তি ব্যকুল হয়ে ভাই কে জিজ্ঞেস করে " ভাইয়া!!.... সত্যি করে বল আজ কি হয়েছে?!..."
: ওই উল্টা পাল্টা সব ডিসিশান নিয়েছিলো তাই নিয়ে আলভি'র রাগ করেছে....
: উনি কাউকে মেরেছেন নাকি?!...
: আরেহ না!!... দেয়ালে ঘুষি দিয়েছেন তোর আলভি ভাইয়া!.....
: কেন?!...
: আপুনিরে!!... খুব ক্লান্ত একটু রুমে যাই?....
: হুম যাও...যাও....
সুপ্ত'র সাথে সুপ্তিও সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে। আলভি'র রুমের দিকে তাকিয়ে দেখে এখনো লাইট জ্বলছে, গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। সুপ্ত কিঞ্চিৎ ভ্রু কোচকে বিষয় টা খেয়াল করলেও কিছু একটা ভেবে নিজের রুমে চলে যায়।
এদিকে সুপ্তি বেশ কিছুক্ষণ পর ইতস্তত করে আলভি'র দরজায় নক করে।
: ভিতরে আয় সুপ্তি!!...
: কিভাবে বুঝলেন?!....
: উত্তর না পেলে তো তোর ঘুম হবে না!...
: হুম্ম... তাহলে বলে দেন...
হাতের ব্যান্ডেজ খুলে আলভি বলে " অনিয়ন্ত্রিত যে কোন কিছুই... নিজেকেই আঘাত করে.... "
সুপ্তি কিছু বলতে পারে না আলভি'র কেটে যাওয়া হাত দেখে কান্না চলে আসে।
আলভি সুপ্তি'র এক হাত ধরে টেনে এনে খাটে বসিয়ে বলে " এই পাগলি!!... কান্না করছিস কেন?!.."
: নিজেকে কষ্ট দিয়ে কি পান আলভি ভাইয়া!!....
: কিছুই না!!....
: তাহলে?!...
: আহ!... আজ আমার এই কাটা হাত দেখেই তোর কষ্ট হয়!!.... ভিতর টা দেখলে কি করবি রে?!!!.....
সুপ্তি কোন জবাব দেয় না মাথা নিচু করে কান্না করছে।
আলভি আবার বলে " সুপ্তি!!.... জানিস তুই আমার অনেক আদরের!!.... সেই ছোট্ট সুপ্তি!!.. যাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসা নিয়ে কোলে নিয়েছিলাম...... আজও তুই আমার কাছে সেই রকমই.... তুই যে পথে হাটছিস এটা শুধুই মোহ!!.... বুঝলি?!!....
আলভি'র দিকে চেয়ে সুপ্তি বলে " আ... আপনি ঠিক.. ক... কি বলছেন আলভি ভাইয়া?!!....."
সুপ্তি'র চোখে চোখ রেখে আলভি বলে " তোর চোখ আমি পড়তে পারি.... তোর ভিতরে যেই ঝড় হচ্ছে সেটা কে নিয়ন্ত্রণে রাখ!!....এটাই ভালো হবে!!....."
সুপ্তি'র হৃদপিন্ডের গতি বৃদ্ধি পেলেও কেমন যেন কষ্ট হয় আলভি'র এই কথায়, অস্ফুটস্বরে বলে " আলভি ভাইয়া!!....."
: জীবনের উত্থান পত্তন কখন কিভাবে হবে কেউ জানেনা!!..... জানিস!!.... সুপ্ত আমার কত কাছের!!.... শুধু এই বন্ধুত্বের জন্য জীবনে কত কিছু বাদ দিতে চেয়েছি.......
: কেন?!.... কি হয়েছে ভাইয়া'র সাথে?!....
: আমার মন বলছে.... আমি শুধু সুপ্ত কে না আজকের পর থেকে.... তোকেও হারিয়ে ফেলবো!!!.......
: কি এমন হয়েছে?!!....
আনমনে আলভি বলে দেয় "আম্মি'র কথা সত্যি হয়ে যাচ্ছে!!!....."
: ক... কি বলেছেন আন্টি?!....
: হুম্ম??.... না কিছুনা!... যা ঘুমিয়ে পর!!....
: আলভি ভাইয়া!!.... আমি....
: শ...শ....শ... এমন কিছু করিস না যেটাতে নিজেকে কষ্ট পেতে হয়....
: আপনি কষ্ট পাননা!!....
: হুম্মহ!!..... আমার অভ্যেস আছে রে!!....
: আমিও অভ্যেস করে নিবো!!...
: সুপ্তি!!!.... রুমে যা!!....
: কেন?!.... কথা বললে কি হবে?!....
: কিছুই না... বল... কি বলবি?!...
: অনেক কথা!!.... কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না!....
আলভি একটি ট্রলি বের করে তাতে ওর জামা কাপড় তোলে আর বলে " কিছু কথা বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইবে... কিন্তু যতক্ষণ বলবি না ততক্ষণই তোর মঙ্গল!!....."
: আ... আপনি... ট্রলিতে জামা তুলছেন কেন?!....
: আহ!! এখন থেকে.... আমি এখানের মেহমান!!...
: ম... মানেহ?!....
: আফতাব কোং আর ফারহান এগ্রো আজকে থেকে সেপারেট হয়ে গেলো!!....
: কিইইহ!!...
: হুম্মম্মম....
: ক... কিন্তু কেন?!!....
: জানিনা!!.... হয়ত জানতে দেয়া হচ্ছে না....
: না... না.... যাইহোক আলভি ভাইয়া.... আপনি যেতে পারেন না!!....
: পাগলিরে!!.... এটা এখন আর আমার ঘর না!!... আমার তো বাড়ি আছে... কেউই থাকে না.... আমাকেই থাকতে হবে তো...
: আলভি ভাইয়া!!... প্লিজ!!.... আমি কি করবো.... বলে ডুকরে কেদে ওঠে সুপ্তি।
আলভি'র ভিতরেও অস্থিরতা বাড়ছে নিজেকে স্বাভাবিক করতে বেলকনিতে চলে যায়। সুপ্তি সেখানে বসেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছিলো। মিনিট পাচেক পর আলভি ফিরে এসে সুপ্তি'র মাথায় হাত রাখে, সুপ্তি চোখের পানি মুছে আলভি'র দিকে তাকায় " আমি চলে যাচ্ছি ঠিকিই... কিন্তু তোকে তো ভুলে যাচ্ছি না... দেখতে আসবো তোকে!!...."
: ভাইয়া জানে?!....
: কেউ জানেনা!!.... আর কিই বা হবে জানিয়ে?!.....
: এটা কি হলো আলভি ভাইয়া!!.... আমিতো আপনার সাথে ভালো করে কথাও বলতে পারলাম না!!....
সুপ্তি'র চোখের পানি মুছে আলভি কিছুক্ষণ একমনে চেয়ে থাকে, আলভি'র হৃদয়ে যে তীব্র রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেটা সে প্রকাশ করতে চায় না। সুপ্তি'র এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে " সুপ্তি!!!!..........." কন্ঠ চেপে আসে আলভি'র আর কিছুই বলা হয় না। মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, নিশব্দে সিড়ি ভেঙে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে। সুপ্তিও ছুটে আসে আলভি'র পেছনে এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে কান্না ভেজা গলায় বলে " আলভি ভাইয়া!!!..... আমি সাত টা বছর তোমার অপেক্ষায় ছিলাম!!..... তুমি এসেও এভাবে কেন চলে যাচ্ছো?!!......দেখ!!... আজও তো আকাশে চাঁদ!!!..... "
আলভি গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয় " নিজেকে ভুল কোন মায়ায় জড়াস না!!!...... আমার অনেক গল্প আছে... আমার ঠিকানা অন্ধকারে!!...... আমার থেকে সবার মতো তুই ও দূরে থাক!!...."
: তুমি পারবে... তোমার মন অনেক শক্ত!!.... কিন্তু আমি পারবো না.... অনেক মিস করবো আলভি ভাইয়া!!!.....
: হয়ত!!...
: তুমিই না এই বাসার নাম দিয়েছিলে কুঞ্জন.... যেখানে সবার কুঞ্জনে মুখরিত থাকে.... তাহলে??...
: সময়ে সব কিছুই চেঞ্জ হয়ে যায়!!....
: তুমি একটু দাড়াও না!!.... আমি একবার মা... ভাইয়া কে ডাকি?!....
: কেন আমার কষ্ট বাড়াতে চাস সুপ্তি!!.... যা ভেতরে... চলে যা....
সুপ্তি আলভি'র হাত ছেড়ে দেয়, বিধস্ত শরীর যেন আর সামনে এগোয় না বহু কষ্টে নিজের ঘরের বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। আলভিকে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আলভিও কিছুক্ষণ তার ছোটবেলার সাথী'র দিকে চেয়ে থাকে, চোখের নোনাজলে ভিজে যায় গাল। নতমস্তকে ধীর পায়ে এগিয়ে রাতের নিকষ কালো আধারে মিশে যায়। আলভি অদৃশ্য হতেই সুপ্তি চিৎকার করে ওঠে " আলভি ভাইয়া!!!!!!.................."
জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় সুপ্তি'র কোমল শরীর খানা।
0 Comments