লেখিকাঃ আবিদা সুলতানা
কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ। যাদের অতিরিক্ত রোমান্টিক গল্প পছন্দ, তাদের জন্য এই গল্প নয়। অনুগ্রহ করে মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না। পুরো গল্প জুড়ে থাকবে ধোঁয়াশা, যা উদঘাটন করতে সত্যিকারের ধৈর্য প্রয়োজন। শুধুমাত্র রহস্যভেদে আগ্রহী পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত।
রাতের গভীরতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটি অন্তর্দহন। বিয়েবাড়ি থেকে ফেরা পূর্বিকার স্নিগ্ধ অবয়বে গভীর ক্লান্তির রেশ! রজনীর দ্বাদশ প্রহর। পূর্বিকা হাতের মোবাইল আঁকড়ে ধরলো। আফ্রিদির নাম্বারে অবিরাম রিং হচ্ছে, অথচ সাড়া নেই। ৮৮ বার ফোনের পর, অবশেষে ওপার থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর; একেবারেই অপরিচিত, কোনো ব্যথার সুর।
কণ্ঠস্বর শুনে পূর্বিকার অন্তর বাষ্পিত হলো সংশয়ে। কিছু হলো না তো? বারংবার জিজ্ঞাসার চাপাচাপিতে অস্পষ্ট উচ্চারণে আফ্রিদি জানালো, সে সেখানে, যেখানে তাদের ভালোবাসা প্রথম রঙিন হয়েছিল। পূর্বিকার হৃদয় কেঁপে উঠলো, নদীর পাড় ছাড়া আর কোথাও হতে পারে না এ জায়গা। কুণ্ঠিত অথচ দৃঢ় মনোবাসনায় পা বাড়ালো পূর্বিকা, কখনো বাবা, চাচা, বা ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া কোথাও একা না যাওয়া মেয়েটি; মধ্যরাতে ছায়ার মতো বেরিয়ে গেলো।
শিকদার বাড়ির দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারের পথ ধরে, বাড়ির পেছনে বাগানের ছায়া এড়িয়ে চোরের মতো গা-ঢাকা দিয়ে এগিয়ে চললো; গেইট হতে বেরিয়েই সামনে বিস্তৃত হলো তাদের বিশাল, নির্জন কৃষিজমির ধূসর বিস্তৃতি। কিন্তু হঠাৎ, জমির ভেতর থেকে কানে এলো কোনো এক অজ্ঞাত, তীক্ষ্ণ শব্দ, যেন অশরীরী কোনো মর্মর। তার পা আরও বেগে দৌড়াতে লাগলো। পরনে আফ্রিদির দেয়া শাড়ির আঁচল হাতে পেঁচিয়ে আল্লাহ্র নামে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিরন্তর দৌড়াচ্ছে পূর্বিকা। তার আফ্রিদি আজ নিঃসঙ্গ; সে জানে, কিছু হয়েছে আফ্রিদির, ভীষণ কিছু।
নদীর ধারে এক অনন্ত নীরবতা, আকাশে পূর্ণচন্দ্রের আলো, আর সেই জোছনার তলে নিঃশব্দে শুয়ে আছে আফ্রিদি, অন্তরের বেদনাতে অবগাহিত এক বিপর্যস্ত প্রেমিক। তার চোখের কোনে টলমল করছে অশ্রু, নিজের ভালোবাসারই প্রতিফলন। পূর্বিকার প্রতি গভীরতম ভালোবাসা নিয়ে ভগ্নহৃদয়ে কাতর সে। ভেবে কাঁপছে—পূর্বি, তার পূর্বি! তার কপালে অন্য কোনো পুরুষের ঠোঁটের অধিকার? তার প্রিয়জনের কোমল, অপাপবিদ্ধ কপাল অন্য কেউ স্পর্শ করবে? কোনো অকস্মাৎ বাহু বেষ্টন করবে তার প্রণয়িণীকে? না, এই দুর্বিসহ প্রতিচ্ছবি সহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব!
এতকাল ধরে প্রেমের সমস্ত শিষ্টাচার মেনে চলেছে আফ্রিদি। কখনো তার কোমল ও নিষ্পাপ স্পর্শকে অপবিত্র করার দুঃসাহস দেখায়নি। পূর্বিকার কচি ঠোঁটের পরশের আকাঙ্ক্ষায় কতবার উদিত হয়েছে তার অন্তর্লীন পুরুষত্ব, কিন্তু সেই বেগবান প্রবৃত্তিকে কী কঠোর সত্ত্বায় নিবৃত্ত করেছে! পূর্বিকা অজস্রবার তার সত্ত্বাকে উপহার দিতে চেয়েছে, তবুও প্রত্যেকবার আফ্রিদি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, তার স্পর্শের নিখাদ পবিত্রতাকে রক্ষা করার এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ থেকেছে নিজে পুরুষ হয়েও।
ভীষণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ আফ্রিদি, সমস্ত জাগতিক বোধশক্তি হারিয়ে পড়ে আছে; ম'দে মাতাল সে। হৃদয়ের গভীরে এক গহীন প্রশ্ন; এত অগাধ ভালোবাসা সত্ত্বেও কেন পূর্বিকা অন্য কোনো পুরুষের কাছে যাবে? এই এক অসহনীয় চিন্তায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন তার চেতনা। ঠিক এমনই মুহূর্তে, হঠাৎ তার কানে আসে এক চিরচেনা স্বরে কাঁপা কাঁপা ডাক,
———" আ-আফ্রিদি??"
পূর্বিকার কণ্ঠ, যার প্রতিটি শব্দ তার অন্তরের গভীরে স্পন্দিত হয়। পূর্বিকা ছুটে এসে তার কাছে বসে পড়ে, আফ্রিদির মাথা নিজের কোলের ওপর তুলে নিয়ে অশ্রুসজল কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
——— "কী হয়েছে তোমার? তুমি এখানে এভাবে পড়ে আছো কেন?"
আফ্রিদির অচঞ্চল মাতাল চোখ নিবদ্ধ হলো পূর্বিকার পানে। এই নারীকে সে এমনভাবে ভালোবেসেছে; ভালোবাসার স্রোতে সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করেছে। পূর্বিকার অন্তরের গভীরে যখন নারীত্বের আকুতি জেগে উঠেছিল, তখনো সে আত্মসম্মান ও পবিত্রতার পরাকাষ্ঠায় নিজেকে আটকে রেখেছে সুপুষের ন্যায় ফিরিয়ে দিয়েছে পূর্বিকাকে । তবু আজ এই বিষাদময় রাতের তলে, মাতাল অবস্থায়, তার অন্তরের গভীরতায় এক অসীম আকাঙ্ক্ষা দোলায়িত।
মদের বিষময় মোহে নিমজ্জিত আফ্রিদি যেন তার স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়েছে; তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রয়েছে পূর্বিকার উপর, যেন সে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। পূর্বিকার নাকে ভেসে এলো তীব্র মদের গন্ধ, এবং তার হৃদয় শঙ্কিত হলো। এ কি সত্যিই তার আফ্রিদি? এতকালের পরিচিত, সংযমে আবদ্ধ প্রেমিক কি এইভাবেই অচেনা হতে পারে? কিন্তু আজকের আফ্রিদির চোখে তীব্র আকাঙ্ক্ষার দাবানল; তার মধ্যে সুপ্ত পুরুষত্বের এক গভীর জাগরণ ঘটেছে।
যদি তার চেতনা সজাগ থাকতো, হয়তো সে নিজের দুর্বার আকর্ষণকে জ্বালাময় বেগে দমিয়ে রাখত; হয়তো তার অচেতন হাত নিজের চুল ছিঁড়ে ক্ষান্ত থাকত; তবু কখনো পূর্বিকাকে স্পর্শ করত না। কিন্তু এখন, সে নিজস্ব আত্মশক্তির লাগাম হারিয়েছে। আজ সে পূর্বিকাকে পেতে চায়, তার অস্তিত্বে মিশিয়ে নিতে চায়। এই উন্মত্ত মুহূর্তে পূর্বিকার শরীর তার একান্ত অধিকার বলে দাবি করছে।
আফ্রিদির অন্তরের এক অদ্ভুত ভাবনায় দোলা দিল—যদি তাকে স্পর্শ করে আজ নিজের করে নিতে পারে, তবে হয়তো পূর্বিকা আর কোনোদিন অন্য কোনো পুরুষের দিকে যাবে না!
পূর্বিকার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন শীতল স্রোত বইতে শুরু করল। আফ্রিদির দৃষ্টিতে অচেনা এক তীব্রতার দীপ্তি, এমন চাহনি তার পূর্বে কখনো দেখেনি। ঢোক গিলে ফিসফিসে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
——— "ত-তুমি ওভাবে ক-কেন চেয়ে আছো?"
আফ্রিদির চোখে তখন মোহের গভীরতা, এক অমোঘ নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে, মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে বলল,
——— "আ-আমি তোমাকে আজ নিজের করে নেব! একান্ত আমার অধিকার করে নেব, যেন তোমার চিন্তা আর কোনো পুরুষের ছায়া অব্দি স্পর্শ করতে না পারে।"
আবেগ আর ম'দের মোহে মাতাল আফ্রিদির মাঝে এক অন্ধকার প্রবৃত্তির উন্মাদনা জেগে উঠেছে, যা পূর্বিকার চোখে জন্য সম্পূর্ণ অচেনা। উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো সে পূর্বিকার ওপর, এক মুহূর্তের জন্যও তার আবেগ সংযত করল না। পূর্বিকার দেহ থেকে নিজেরই দেওয়া শাড়ি নিঃসঙ্গ উদ্দমতায় ছিঁড়ে টেনে খুলে দিলো, নিজের দখলে নিলো তার প্রতিটি স্পন্দন। পূর্বিকার চোখে দগ্ধ বিষণ্ণতা, প্রিয়জনের স্পর্শে আবদ্ধ, অথচ সেই স্পর্শ আজ রি'ক্ততায় মোড়ানো।
প্রেমিকের এই হিং'স্র আচরণে পূর্বিকা বারংবার নিজেকে মুক্ত করার জন্য ছটফট করতে করতে একসময় হতাশ হয়ে আত্মসমর্পণ করল। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নীরব অশ্রুবিন্দু, যা এই অপরিসীম ব্যথার অনুচ্চারিত ভাষা হয়ে উঠে এল। এই কি সেই আফ্রিদি, যে কখনো পূর্বিকার নিবেদনকেও সংযমের তলপটে ফিরিয়ে দিয়েছে, জাগতিক আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে নিজেকে রেখেছিল? পূর্বিকার মনে বারবার আঘাত হেনে চলল সেই পুরনো স্মৃতি—যখন সে আফ্রিদিকে প্রতিজ্ঞা করেছিল, অন্য কোনো পুরুষ তাকে স্পর্শ করবে তার আগেই যেন মৃ'ত্যু তাকে গ্রাস করে।
আজ বুঝি সেই প্রতিজ্ঞার এক ভিন্ন পরিণতি উপস্থিত হলো; মৃ'ত্যু হয়ত তাকে গ্রাস করেনি, কিন্তু প্রিয়জনের স্পর্শে বিলীন হয়ে সে অচেনা বেদনার সমুদ্রে নিমজ্জিত হলো। তার মনের গভীরে সেই কর্কশ সত্যের প্রতিধ্বনি তার অপছন্দনিয় বড় ভাই শান্ত বলেছিল, “ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই, যা আছে তা কেবল লালসা।” আজ তার অন্তরভেদী বেদনার মাঝে, পূর্বিকা যেন সেই কথার নির্দয় সত্য উপলব্ধি করল।
---
মাতাল আফ্রিদির নিষ্ঠুর অবসন্নতার আঁচলে মোড়ানো সেই নিবিড় মুহূর্ত শেষে, যখন আফ্রিদি তাকে মুক্তি দিল, এরপর সে সেখানেই নিদ্রামগ্নতায় আচ্ছন্ন হলো! পূর্বিকা ক্লান্ত, ভগ্ন হৃদয়ে নিস্তব্ধ রজনীর অন্ধকারে নিজেকে গুটিয়ে বাড়ির পথে চলতে শুরু করল। শরীরের ছিন্নভিন্ন শাড়ির খোলা প্রান্তে নিজেকে পেঁচিয়ে, ক্লান্ত পায়ে ধীর, তবু অবিচল পদক্ষেপে খুড়িয়ে খুড়িয়ে সেই পথ ধরল, যেই পথ বেয়ে চুপিসারে এসেছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এক নীরব আর্তনাদ সৃষ্টি করছিল, এবং হৃদয়ে সেই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আরও তীব্রভাবে।
অগোছালো মূর্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে কোনোমতে দরজাটি বন্ধ করে দিয়ে এক শূন্যতায় ভরপুর ক্রন্দন অশ্রুজলে তার ব্যথিত হৃদয়ের ভার লাঘব করছিল। গভীর নির্জনতায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে চোখের জল অবিরাম ঝরতে লাগল, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু তার অন্তর্দাহের মৌন সাক্ষ্য বহন করছে। কী করবে সে এখন? তার বিশাল পরিবারের সন্মান, তার নিজের পরিচয় আজ ক'ল'ঙ্কে'র গ্লানিতে ম্লান হয়ে গেল। সমাজের কটু দৃষ্টির সম্মুখীন হবে তার প্রিয় পরিবার, মাটিতে মিশে যাবে তাদের গৌরব, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে নিন্দা আর অপমানের বিষাক্ত শিকড়।
এই মহাসমুদ্রসম ব্যথার মাঝে দাঁড়িয়ে, পূর্বিকার মনে হলো, সে গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আশার কোনো আলো নেই, শুধু ক'ল'ঙ্কে'র কালো ছায়া তাকে প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
কোনো উপসংহার, কোনো অবশিষ্ট অপেক্ষা আর না রেখে, পূর্বিকা সিদ্ধান্ত নিলো তার জীবননদীকে অকস্মাৎ শেষপ্রান্তে পৌঁছিয়ে দেবে। সমস্ত জড় অনুভূতি আর অবিরাম তিক্ততার ভারে জর্জরিত মন নিয়ে খাটের ওপর চেয়ারের নড়বড়ে অবস্থান থেকে জীবনের শেষ ধাপ বেছে নিলো। শরীরে আলগা জড়ানো সেই শাড়িটি, যা একসময় প্রেমের উপহার হিসেবে পেয়েছিল, আজ তার বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নির্মমভাবে গলা জড়িয়ে ধরল। ফ্যানের সঙ্গে শাড়ির বুনন সেঁটে গেঁথে নিতে গলায় জড়াল তার জীবনের শেষ স্পন্দন।
চোখ মুদে একে একে স্মরণ করল সকল প্রিয়জনকে, আর মনে পড়ল সেই সর্বাধিক অপছন্দের বড় ভাই, শান্ত। তার গরলভরা কথা আজ মধুর মতো মনে হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, শান্তর মৃদু স্নেহবাক্য যদি আজ পাশে থাকত, তবে হয়তো এমন তিক্ত পরিণতির পথ বেছে নিতে হতো না। অশ্রুজলে ভিজে উঠল চোখ, জীবনের শেষ প্রতিফলন তার হৃদয়ে ঝরঝর করে ফুঁসে উঠছে।
শেষবারের মতো উচ্চারণ করল সেই নাম, যে তার সব সত্তাকে সিক্ত করেছিল, আর সেই একই সত্তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিলো,
——— "তোমার স্পর্শেই আমার মৃত্যু হলো, আফ্রিদি।"
এক কঠিন প্রস্থানে দৃঢ় সিদ্ধান্তে শেষ লাথিটি দিয়ে চেয়ারকে দূর করে দিল।
_________________
সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনে নীরবতা নেমে এলো, যেন নির্বাক এক শোকের আবেশ! আফ্রিদির বিষণ্ণ নয়নে লালাভ ম্লানতা; দৃষ্টি টলমল, অশ্রুসিক্ত! মুগ্ধর মুখ উত্তপ্ত র'ক্তিমতায় রঞ্জিত; রুদ্রের মুখে এক দৃঢ়, শীতল গম্ভীরতা। মহুয়ার চক্ষুপল্লবে অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো, নীরবে অবলোকন করছে সকলেই।
পরম যন্ত্রণায়, কণ্ঠস্বর ভাঙা তানে আফ্রিদি উচ্চারণ করল,
——— "এত রাতে সে আসবে, এমন কল্পনাও করিনি! আমি... তাকে ডাকিও নি; সে মুহূর্তে আমি ছিলাম অর্ধস্মৃত.. মাতাল; নিজস্ব বোধবুদ্ধিহীন এক বিবশতায় আচ্ছন্ন। হৃদয়ের অবাধ্য আকুলতাগুলোকে প্রতিহত করতে পারিনি! তখন মনে হয়েছিল, তাকে সম্পূর্ণ অধিকার করার একমাত্র পথ এটাই; যে পথে আমি তার পরিবারকে আমার হাতে তাকে সমর্পণে বাধ্য করব, এবং তার চিত্তে আর কোনো পুরুষের ছায়া কখনো পড়তে পারবে না।"
আফ্রিদির কণ্ঠ হাহাকারে রুদ্ধ, অশ্রুতে ভেজা বিবর্ণ মুখটি শূন্যতায় ঢেকে গেছে। ক্ষীণ অথচ জর্জরিত কণ্ঠে সে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
——— “কিন্তু আমি কল্পনাও করিনি! আমার প্রিয় পূর্বি এভাবে চিরতরে, অমোঘ শূন্যতায় হারিয়ে যাবে! আমি বি'ষের তীব্র বি'ষা'ক্ততা গলায় ঢেলে আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলাম; কিন্তু মৃ'ত্যুও যেন আমাকে পরিহাস করে এড়িয়ে গেছে! এত সহজ পরিণতি আমার জন্য নয়! আমার পূর্বি আর নেই, অথচ আমি রয়েছি এই নিষ্ঠুর দুঃখের শিকলে বন্দী! আমাকে এই অনন্ত কষ্টের আ'গু'নে পুড়ে খাক হতে হবে! যেকোনো ভয়াবহ শাস্তি, যেকোনো নিদারুণ যন্ত্রণা, সব আমাকে দে! কারণ আমি..... আমি এই দুঃসহ শাস্তির যোগ্য!
মুগ্ধর বুকের গহ্বর থেকে দীর্ঘশ্বাস ছিন্নমূল এক মর্মস্পর্শী আর্তনাদে বেরিয়ে এলো। চোখ মুদে সে নিজেকে সংবরণ করে কঠোর কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
——— “বারংবার বলেছিলাম, তোর সঙ্গে একান্তে কিছু কথা আছে! শুনতে চাসনি! যতবারই দেখা করতে গেছি, ততবারই কর্কশ অস্বীকৃতি দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিস! কর্মের ফাঁকে হাজারবার ফোন দিয়েছি; কিন্তু ধরা দূরে থাক, একবার প্রতিত্ত্ব করে দেখিসনি! কখনোই আমি পূর্বিকাকে প্রকৃত অর্থে ভালোবাসিনি; বিয়ের পরিকল্পনাটাও ছিল নিছকই এক প্রণোদিত কৌশল! এই সত্য তো তুই উপলব্ধি করতে পারতিস, যেদিন প্রথমবার তুই আমার দিকে ছু'রি তাক করেছিলি, আর তবুও আমি তোর পশ্চাতে ছুটেছি, কিছু অনুচ্চারিত কথা বলার জন্য। কিন্তু সেই কথাগুলো তো শুনতেই চাসনি!”
মুগ্ধ ক্ষণিক থেমে, গভীর তিরস্কারের সুরে বলল,
——— “আজ যখন নিঃস্তব্ধতায় নিমগ্ন হয়ে বসে আছিস, যদি তখন সামান্য নিরবে আমার কথাগুলো শুনতি, তবে হয়তো এই পরিণতি ভিন্নরূপে প্রবাহিত হতো! অতিরিক্ত ক্রো'ধ, অস্থিরতা, অধৈর্যতা কেমন করে তোকে এমন ঘোর অন্ধকারে নিপতিত করেছে দেখেছিস? আজ এই তোর অস্থির উন্মত্ততার পরিণামে কারাগারের প্রকোষ্ঠে তোর মুক্তি নেই; আর তোর জন্যই তোর ভালোবাসার মানুষটি তোকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। একাই গুমরে ম'র, এই পাপের বোঝা বইবার জন্য তুইই যথার্থ!”
মুগ্ধ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। র'ক্তাভ চক্ষু কঠোর সংকল্পে জ্বলে উঠল, নিস্পৃহ পায়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো, পিছনে ফেলে গেলো তার অপরাধী বন্ধুটিকে; যে এককালে ছিল তার অন্তরের কোথাও এক গভীর কোণে। কিন্তু আজ, সেই বন্ধুর পাপ সীমা অতিক্রম করেছে! মুগ্ধ জানে, তার মনকে কঠোর করতেই হবে!
বাইরে এসে অস্থির ক্রো'ধে মুগ্ধ কাঁপতে লাগল; বুকের ভিতরে নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাসের ভার তাকে দগ্ধ করছে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটারে জ্বালালো, আর উত্তাল ক্রো'ধে পাগলের মতো টেনে টেনে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল। অন্ধকার আকাশে সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী মিশে যেতে লাগল, আর র'ক্তাভ চোখ বুজে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল,
——— "নারী! হে বিনাশিনী, তুমি সর্বগ্রাসী অগ্নিশিখা, যে দহন-মন্ত্রে জগৎ ছারখার করে! তুমি অনিত্যতার পরিহাস, প্রলয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব বিভীষিকা। কালরাত্রির মতো গাঢ়, বিভ্রান্তির অশুভ আবেশ, মহাশূন্যে বিচরণ করা অসীম মায়ার মৃত্যু-বাঁধন তুমি! তুমিই চিরন্তন ধ্বং'সের প্রতিমা!"
___________________
পরদিনের নিস্তব্ধ সকালের আকাশ বিষাদমাখা ভারে ঢেকে গেছে। পূর্বিকা, ইকরাম আলী এবং বৃদ্ধের নির্বাক দেহগুলো ফরেনসিক ল্যাবের শীতলতার আঁধার ছেড়ে ফিরেছে, মৃ'ত্যুর পর তাদের শেষ স্নানে স্নাত করা হয়েছে। সাদা কাফনে আবৃত সেই নিথর দেহগুলো খাটিয়ার ওপর শায়িত, চিরন্তন ঘুমের শান্তিতে মগ্ন। চারপাশে শোকের ক্রন্দন বয়ে যাচ্ছে, যেন প্রতিটি হাহাকারে সেই চিরবিচ্ছেদের গভীর বেদনা রচিত হচ্ছে।
আফিয়া বেগম, মেয়ে আর স্বামীর শূন্যতা ভরা শবের সামনে চোখের কোণ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে; বুকের গভীরে বিধৃত সেই ক্ষত, যা কোনো সান্ত্বনার ঔষধে মোছা সম্ভব নয়। ইকরাম আলীর বাবাকে হুইল চেয়ারে নিয়ে আনা হয়েছে ছেলে আর নাতনির লাশের সামনে! যাতে শেষবার দুচোখ ভরে দেখতে পারে মুখগুলি! চোখের কোণে তার জল!
পাশে শায়িত ছোট বোনটির নিষ্প্রাণ মুখের দিকে চেয়ে আছে শান্ত এক দৃষ্টিতে, নীরব ভাষায় বলছে "এত ঘৃণা সহ্য করেও কী গভীর ঘুমে মগ্ন তুই আজ!"
কোনো এক অজানা অভিমান শান্তর বুকে দগ্ধ হতে লাগল। এই বোনটিকে কতবার তিরস্কার করেছে, কতবার কঠোর কথায় আহত করেছে। ভাই হিসেবে হয়তো কখনো আদরের হাত বাড়ায়নি; শুধুই তিক্ততা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। আজও কি মৃ'তের শীতলতায়ও তাকে ঘৃ'ণাই করে যাচ্ছে? চোখে লাল অশ্রু গড়িয়ে খাটিয়ার ওপর ঝরে পড়ল, এক চিরন্তন শোকের চিহ্ন হিসেবে। খাটিয়ায় হেলে ছোট বোনটির শীতল মুখমণ্ডলে বারবার টুকরো টুকরো চুম্বনে ঢেকে দিল, যেন সেই তি'ক্ততার আ'গুনকে তিরোহিত করে চিরবিদায়ের ক্ষণে নিজের অপূর্ণ স্নেহের ঋণ শোধ করতে চায়।
আঁখির চোখের বাঁধ এবার সত্যিই ভেঙে গিয়েছে; হৃদয়ের পাথরও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধূলিসাৎ হয়েছে। কত স্নেহে, কত যত্নে পূর্বিকা তাকে আগলে রেখেছিল! এ কেবল বোন নয়, এক আশ্রয়; বড় বোন, আদরের মায়া। চাচাতো হোক বা আপন, ভালোবাসার গভীরে তো কোনো প্রান্ত নেই। এখন সেই স্মৃতির গভীরে, আঁখির কোলে মাথা রেখে আলো হাউমাউ করে কাঁদছে। আঁখির চোখের অশ্রু যেন ঝরছে নিরন্তর, অবিরাম এক প্রবাহে। কত আপনজন হারাবে সে? হৃদয়ের ক্লান্তি আজ তার অন্তর্লীনে আর্তনাদ করছে। যারাই তার জীবনে আলো হয়ে আসে, তাদেরই কেন নিয়তি কেড়ে নেয়?
এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই; জীবন শুধু তাকে এই অ'ভিশপ্ত ভাগ্যের অসীম নিস্তব্ধতা দিয়েছে। অভিশপ্ত—নিজেকে সে এমনি এমনি তো অভিশপ্ত নারী আখ্যা দেয়নি! তার জীবন নির্মম নিয়তির এক নির্মোহ রসিকতা, যে বারবার তার কাছ থেকে আলো কেড়ে নেয়, অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখে যায়।
নির্জন বাতাসের স্নিগ্ধ স্পর্শে হাওয়া নাঈমের পিঠে নীরব সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে চলেছে। পাথরের মতো নির্জীব হয়ে পড়েছে ছেলেটা; কোনো শব্দ বা সংবেদন তাকে আর স্পর্শ করতে পারে না। হঠাৎই ঘাড় ঘুরিয়ে হাওয়ার দিকে দৃষ্টি ফেলল নাঈম। মেয়েটির চোখের কোণে অশ্রু জমেছে, তবুও নিজের শোকের ভার সামলে সে দাঁড়িয়ে আছে নাঈমকে আগলে রাখতে, যেন তাকে টুটে যেতে দিতে চায় না। তাকালো পূর্বিকার দিকে ফের ; এই বোনটিকে সে কত যন্ত্রণা দিয়েছে, কত মজার ছলে বিব্রত করেছে, আর সেই সবকিছু এখন স্মৃতির স্রোতে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠছে; সেই ছোট্ট, দুরন্ত পূর্বিকা; যে মুখভঙ্গি করে দৌড়ে পালাতো তার কাছ থেকে।
ইকরাম আলীর মৃত্যুতে দুই ভাইয়ের হৃদয়ে গভীর শোকের ঝড় নেমেছে কিনা সে অজানা; তবে পূর্বিকার এই চিরবিদায় তাদের ভেতরে অবর্ণনীয় শূন্যতার আর্তনাদ তৈরি করেছে। শান্ত—যার পাষাণ হৃদয়কে কেউ কখনো আর্দ্র ভাবেনি, সে আজ কাঁদতে জানে! আর সেই উচ্ছল নাঈম, যার হাসিতে আকাশ আলো করে উঠতো, সে আজ যেন নিঃশব্দ পাথর হয়ে গেছে।
ছোট বোনের হারানো ব্যথা তাদের সমস্ত সত্তাকে ধ্বং'স করে দিয়েছে!
কত শত মানুষের অশ্রুজলে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ, অথচ সেই বৃদ্ধের নিঃশব্দ কান্নার সাক্ষী নেই কেউ। কাঁদছে কেবল তার কয়েকজন সাথী, যাদের সঙ্গে এককালে পথে পথে ভিক্ষা করতো। সন্তান ছিল, পরিবার ছিল, তবু বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে থাকা এই পিতার জন্য কারও মনে স্নেহের দান অবশিষ্ট নেই। যারা তার র'ক্তের সম্পর্ক, তারা তাদের নিজের পথে চলে গেছে; এত দূর, যে মৃত্যুর খবরেও ফিরে আসার প্রয়োজন বোধ করলো না। যদি আসার ইচ্ছে থাকত, তবে যখন তিনি ভিক্ষা করতেন তখনই ফিরত, তখনই তার পাশে দাঁড়াত।
এই তিনটি নিথর দেহ আজ একত্রে মাটির আঁচলে প্রবেশ করবে। গ্রামে আজ এক বিরাট ভীড় জমেছে; দূর-দূরান্তের লোকজন এসেছে, অনেক সম্মানীয়, পরিচিত ব্যক্তিত্বের পদধূলিতে পথ ভরে গেছে। মোশারফ সাহেবের বোন, ফাইজা বেগমও এসেছেন। ইকরাম আলীর প্রতি, এক সময়ে হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিয়েছিলেন তিনি। হ্যাঁ, আজ তিনি সুখের সংসারে আবদ্ধ, স্বামী-সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, তবু সেই স্মৃতিময় অতীতের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যায়; যে মানুষটা তাকে সত্যিকার ভালোবাসত, তার জন্য আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধু এই চিরশান্তির নীরব বিদায়।
কে ধনী, কে দরিদ্র, আর কে যৌবনের তেজে দীপ্ত—অন্তিম পরিণতি সকলেরই এক, কবরে যেতে হবে শূন্য হাতে। ইকরাম আলী, যিনি প্রতাপশালী, কিংবা সেই ভিক্ষুক, উভয়েই সমান—তাদের স্রেফ দেহই আজ মাটির ঘরে আশ্রয় পাবে। যৌবনবতী পূর্বিকারও জীবনাবসান এখানেই থেমে গেল। আর সেই মৃ'ত্যু মর্মে প্রতিক্ষণে দং'শিত আফ্রিদি, যে প্রণয়ে উদ্ভ্রান্ত, আজ জেলের অন্তরালে অনুতাপের আ'গুনে ঝলসে ম'রছে। গভীর আকাঙ্ক্ষা ছিল তার, একান্তই প্রণয়ের গভীরে নিমজ্জিত হয়ে, পূর্বিকাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিজের করে পাবার প্রয়াসে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ, জানাজার সেই সারিতেও তার স্থান নেই। অপরাধের গ্লানিতে সে দণ্ডিত; এক জীবন্ত মৃ'ত্যু, যেখানে একেকটা শ্বাস কেবল বেঁচে থাকার যন্ত্রণা বহন করছে।
ভালোবাসা যেমন মোহময়, তেমনি ভয়ানকও; প্রিয়জনকে অধিকারে আনার এ আকাঙ্ক্ষা কখনো শুভ, কখনো বা ক'ল'ঙ্কি'ত। প্রেমের মোহে যারা তলিয়ে যায়, তাদের কাছে সঠিক-ভুলের বিন্যাস অস্পষ্ট হয়ে যায়। কেবল তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়, আর পথের পবিত্রতা অবক্ষয়ী হয়ে যায়। আফ্রিদির অপরাধ হয়তো অস্বীকারযোগ্য নয়, কিন্তু পূর্বিকাও কি একেবারে নি'ষ্ক'ল'ঙ্ক? সে নিজেই তো আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে, পেছনে ফেলে গেছে অ'ভিশপ্ত প্রেমিককে, যার প্রাণ এখন মলিন, বিপন্ন।
এ এক রাত্রির নেশা, এক মদের বোতলের প্রভাব—এই ক্ষণিকের আবেশেই ধ্বং'স হয়ে গেছে সব। তবু, যদি আফ্রিদি মুগ্ধর পরামর্শে একটুখানি ধৈর্য ধারণ করত, তার করুণ পরিণতি এভাবে লেখা হতো না। ভালোবাসায় যত গভীর হোক, বিশ্বাস রাখতে জানতে হয়। একতরফা উপলব্ধির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো ছলনা হতে পারে, সব দৃশ্যমান সত্য নয়। তাই আজ যাকে আপনি ভালোবাসেন, তার কথার অর্থে প্রবেশ করুন, তাকে বিশ্বাস করুন। অন্যথায়, আপনার ভাগ্যও আফ্রিদির মতোই বিষাদময় পরিণতির অপেক্ষায় রয়েছে।
_______________
সবজির ব্যাগগুলোর ভারে হাত দুটি অবশ হয়ে আসছে রাধিকার! বাজারে গিয়েছিল সে! কিন্তু মনের ভার আজও সজীব, বহু বছরের এক অব্যক্ত বেদনাবোধ। ফিরতি পথে হঠাৎ সামনের বলিষ্ঠ গঠন, গম্ভীর চাহনি এবং কঠোর রূপধারী পুরুষটির দিকে তাকাতেই হৃদয়ের গহীনে চাপা বেদনা যেন তীব্র হয়ে উঠল। স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেল সে। এই সেই পুরুষ, যার কঠোর কথন এবং গাম্ভীর্যে সাত বছর পূর্বে প্রেমের আকাঙ্ক্ষা মাটিতে মিশে গিয়েছিল।
——— "আমি তোমাকে ভালোবাসি, মুগ্ধ!"
মুগ্ধের চোখে ক্ষণিকের বিস্ময়; সদ্য যৌবনের দ্বারে দাঁড়ানো রাধিকাকে দেখছে কিছুক্ষণ অবিরত। পরিচয় আছে, সহপাঠী তারা, তবে সম্পর্কের বাঁধনে কোনো সেতুবন্ধন আজ অবধি সৃষ্টি হয়নি। মুগ্ধর মনে নেই তারা কখনো একান্তে কথা বলেছে কি না; তবে এমন অবকাশে, এমন স্পষ্ট উচ্চারণে প্রেম নিবেদন করবে রাধিকা, তা মুগ্ধের মনের কল্পনায়ও ছিল না। নিজ গাম্ভীর্য বজায় রেখে, মুগ্ধের কণ্ঠে নিরাবেগ উত্তর,
——— "আমিও আমাকে ভালোবাসি।"
রাধিকাকে এহেন প্রত্যুত্তর স্তব্ধ করে দিল না, সে নিরুত্তর নয়। ঠোঁট কেঁপে উঠল সামান্য, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে, নিঃশর্ত প্রেমের প্রত্যয় নিয়ে বলল,
——— "ফাজলামো নয়, আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। তোমার আমার ধর্ম যদি বাধা হয়, আমি আমার ধর্ম পরিত্যাগ করতেও প্রস্তুত; তবু আমাকে অন্তর্ভুক্ত করো তোমার জীবনে।"
হাতজোড় করা এক কাতর আবেদন, তার সরল হৃদয়ের আকুতি। রাধিকা জানে, তার প্রেম আজ এক নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা—হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়েও সে প্রেমাসক্ত মুসলিম মুগ্ধর প্রতি। কী করবে সে? মুগ্ধর সেই দুর্নিবার ব্যাক্তিত্ব, কঠিনতায় মোড়ানো অথচ আকর্ষণীয়, যুদ্ধে, খেলাধুলায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। এই সুকঠিন, দৃঢ়চেতা পুরুষটিকে দেখে একবারও কি প্রেমে না পড়ে থাকা যায়? কিন্তু রাধিকাকে প্রত্যাখ্যান করেই এগিয়ে গিয়েছিল সে।
মুগ্ধ ধীর, নির্মম কণ্ঠে উত্তর দিল,
——— "ধর্মকে খেলনা হিসেবে টেনো না! আমার জন্য ধর্ম বদলাতে চাও? ইসলামকে গ্রহণ করো আল্লাহর জন্য, কোনো মানবের জন্য নয়। মনে রেখো, ধর্ম আত্মার পথ, প্রেমের কামনায় বস্তুগত নয়। আজ আমার জন্য ধর্ম ত্যাগ করছ, কাল অন্যের প্রেমে আবার ফিরবে কি? ধর্ম কোনো খেলনা নয়!"
রাধিকা এক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের গভীর শূন্যতায় সত্যের আঘাত পড়ে। সে জানে, মুগ্ধ ঠিকই বলেছে; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নয়, মুগ্ধকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সে ধর্মের ভার লাঘব করতে চেয়েছে। মুগ্ধ আবারও তার গম্ভীর কণ্ঠে কথা ছুঁড়ে বলল,
——— “আমার হৃদয়ের একমাত্র সিংহাসন ইতোমধ্যেই কারো দখলে; সেখানে তোমার বা অন্য নারীর প্রবেশের অধিকার নেই।”
মুগ্ধ চলে গেল, তার পায়ের শব্দ হৃদয়ের প্রতিটি আঘাতে বিদ্ধ করল রাধিকার মনকে। সেদিন রাধিকা অশ্রুতে বিধ্বস্ত হয়েছিল। সেই প্রথম প্রেম, সেই প্রথম আশা; মৃ'ত্যুস্তব্ধ হয়ে এক অনন্ত শূন্যতায় মিলিয়ে গেল। আজ তার বিবাহিত জীবন, একটি পরিপূর্ণ পরিবার থাকলেও মনস্তলে একটি ছায়া হয়ে মুগ্ধের স্মৃতি রয়ে গেছে। সন্তানহীনতা এবং স্বামীর নির্যা'তনের চক্রে আবদ্ধ জীবন তাকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। যে প্রেম ভুলতে চেয়েছিল, সেই প্রেমই যেন তাকে তার ভুলের প্রমাণ দিয়েছিল। হয়তো তার নিয়তির রেখায় বিধাতার কলম ভালোবাসা রচনা করেনি—শুধুই বিরহের নিস্তব্ধ ছায়া।
তবুও আজ এ স্মৃতি জাগ্রত; সেই নির্মম প্রত্যাখ্যানের মর্মে বিধৃত কিশোরী প্রেমের স্পন্দন, যা বয়সের প্রবাহে ম্লান হলেও অনন্ত কালের গভীরে আজও একটি ব্যর্থ স্বপ্ন হয়ে বিদ্ধ করছে হৃদয়, সেই শ্বেত শুভ্র প্রেম, যা ধর্মের সীমা ভাঙতে চেয়েছিল!
অতীতের এক বিস্মৃত ক্ষতের বেদনায় আকণ্ঠ নিমগ্ন রাধিকার ঠোঁট আজ থমকে গেল, তবু নিঃশ্বাসের আড়ালে এক ব্যাকুল কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল,
——— "মুগ্ধ?"
সময়ের প্রবাহে ক্লান্ত মুগ্ধ রুদ্রের সাথে গম্ভীর কণ্ঠে আলোচনায় মগ্ন; তদন্তের খুঁটিনাটি বিষয়াবলী নিয়ে গভীর তন্ময়তায় কথাবার্তা চলছে, পাশে মহুয়া মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তাদের গন্তব্য শিকদার বাড়ির দিকে। হঠাৎ একটি মৃদু কণ্ঠে নিজের নাম শুনে পেছনে ফিরল মুগ্ধ, দৃষ্টিতে শীতল অনুসন্ধান আর তীব্র সন্দেহের ছাপ। সঙ্গে মুহূর্তেই পেছন ফিরে তাকালো রুদ্র আর মহুয়াও। রাধিকার বুকের ভিতরটা ধাক্কা খেল সেই স্থির দৃষ্টির কাঁপন—একই সেই চাহনি, যা তাকে আজও নিঃশেষে বিদ্ধ করে, আজও তার আত্মা স্পন্দিত করে।
মুগ্ধ রাধিকার অনুভূতিতে প্রতিধ্বনি পেল বোধহয়, রুদ্র আর মহুয়াকে নির্দেশ দিল তার সঙ্গ ত্যাগের,
——— "তোমরা যাও, আমি আসছি।"
মহুয়া একবার চোখ বুলিয়ে রাধিকাকে দেখে রুদ্রের সাথে চলতে শুরু করল। দুজনেই নির্লিপ্তভাবে হাঁটছে, তবু মহুয়ার মনের কোণে একটি নির্দিষ্ট অভিমান জেগে উঠল। কিছুক্ষণ পর সে রুদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করে মৃদু স্বরে বলল,
——— "চকলেট খাবে?"
রুদ্র মুহূর্তে হতবাক হয়ে মহুয়ার দিকে তাকালো, সে শিশুসুলভ অনুরোধ শুনেছে। কণ্ঠে অবজ্ঞা মিশিয়ে বলল,
——— "তুমি কি আমাকে বাচ্চা মনে করছ?"
মহুয়া হাসির প্রান্তে বলল,
——— "না, তবে চকলেট খেলে যদি আমার সাথে একটু কোমলতায় কথা বলো! "
রুদ্রের ভ্রু কুচকে গেল। মহুয়া বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল,
——— "ওভাবে তাকানোর প্রয়োজন নেই। তুমি সবার সঙ্গেই সহজভাবে মিশে কথা বলো, অথচ আমার সাথে কথা বললে তোমার কণ্ঠে একধরনের শীতলতা এসে পড়ে।"
রুদ্র নিঃশব্দে দ্বিধার প্রান্তে দাঁড়িয়ে গভীর অনুধ্যানের ঘোরে ডুবে থাকল। মহুয়ার সাথে কথোপকথনে সবসময় যেন একটি অস্পষ্ট দেয়াল রয়ে যায়, যার অতিক্রম তার পক্ষে অধরাই। গলার স্বর একটু গভীর করে বলল,
——— “সেসব বাদ দাও! আমার মনে হয় এই খু'ন গুলো…”
——— “রাখো তোমার খু'ন! সবসময় শুধু কেস নিয়ে কথা! আর কিছু নিয়ে কথা বলা যায় না? তুমি কি আদৌ মানুষ? তুমি জানো কি তুমি নিজে একটা খু'নি?”
মহুয়া অভিমানের আগুনে যেন জ্বলে উঠল, গতি শ্লথ না করেই জোরে জোরে অগ্রসর হলো, তার পায়ের তালে যেন প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।
রুদ্র দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভিত এক চিরকালীন অজ্ঞতায়, মহুয়ার এই আকস্মিক অগ্নিবাণ কেন, তা বুঝে উঠতে পারল না। তার মুখে যেন এক অবোধ্য কৌতুকমিশ্রিত আভা ফুটে উঠল—মেয়েদের এই অভিমান, এই ক্ষণিকের রাগ-অভিযোগ, তাদের না বলা কথা, এই আবরণময় মনোভাব কি তার কাছে চিরকালই দুর্বোধ্য থাকবে? এসবে নিদারুণ বড্ড কাঁচা সে! ভাবনাগুলো ভাসতে ভাসতে হঠাৎই মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার ঠোঁটে, আজকাল মহুয়ার শিশুসুলভ আচরণ বেড়েছে বেশ; কারণটি অজানা! তবে মন্দ লাগে না! রুদ্র আর কি করার? ধীর পায়েই হাটা ধরল.!
__
——— “বলো, কি বলবে?”
মুগ্ধর কণ্ঠে নির্লিপ্ততার শীতল ধ্বনি। রাধিকা যেন তার সমস্ত দ্বিধাকে ত্যাগ করে সরাসরি উচ্চারণ করল,
——— “কেমন আছো?”
——— “ যা বলতে চাও সোজাসাপ্টা বলো! আমার সময় নেই।”
এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বক্ষ থেকে বেরিয়ে এল; তার ভেতরের চোরাগোপ্তা আকুলতাকে আর অবরুদ্ধ রাখতে পারল না। নিচু স্বরে, ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
——— “সে কেমন আছে?”
——— “কে?”
——— “সাত বছর আগে যার কথা বলেছিলে!”
অপ্রত্যাশিত উত্তরের অপেক্ষায় রাধিকার বুকে ছটফটানি বাড়ল; এক অজানা তৃষ্ণা নিয়ে ভাবতে লাগল সেই রমণীকে, যে নিশ্চয়ই ভাগ্যের সুতোয় বাঁধা, মুগ্ধের হৃদয়ের শাশ্বত অধিকারিণী। কিন্তু মুগ্ধের ঠোঁটে উঠে এল কঠিন শীতলতা; তার চোখের পলক যেন ম্লান হয়ে এলো অতীতের কোনো অস্পষ্ট স্মৃতিতে। সে স্থির, তবে তীক্ষ্ণ স্বরে উত্তর দিল,
——— “ সে মৃ'ত।”
শব্দটি যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হেনে গেল রাধিকাকে; স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার পানে। ‘মৃ'ত’? অর্থ কি এ কথার? মুগ্ধ কি বলছে? রাধিকার মনে সেই শ্যামকান্তি কন্যার ছায়া ভেসে উঠল—যে বৃষ্টির সন্ধ্যায় তাকে মুগ্ধের সান্নিধ্যে একান্ত দেখেছিল বৃক্ষের ছায়ায়। মুগ্ধ, যে স্বভাবতই কটাক্ষ করে কারও স্নেহের সীমানায় প্রবেশ করে না, সেদিন তবু নিজেকে পরিহাসে ভিজিয়ে, কাদা মাড়িয়ে ঝোপ থেকে বড় কচুপাতা এনে ছায়া দিয়েছিল সেই অনিন্দ্যকান্তির শ্যামবর্ণা নারীর মাথায়; এই প্রয়াসে সে সিক্ত না হয় বৃষ্টির জলে। সেই দিনটির স্মৃতি আজ তার হৃদয়কে বিষাদে তাড়িত করল; তবে কি তার ধারণা কেবল মায়ার কুহক? নাকি সেই স্মৃতি, মুগ্ধের সেই কোমলতা, সত্যিই কোনো পরিতৃপ্ত প্রহেলিকার ছায়ামাত্র?
রাধিকা হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার প্রশ্নগুলো গুমরে মরছে অনুচ্চারিত ভাষার আড়ালে। অন্যদিকে, মুগ্ধ একাকী পথের দিকে এগিয়ে যায়। সমস্ত সত্ত্বার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে তপ্ত ক্ষো'ভের উন্মাদনা; নিজের মাথায় হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো টেনে ধরল বিক্ষুব্ধ প্রাণে। যন্ত্রণায় দগ্ধ মন একান্তে ফেটে বেরোতে চাইছে, বি'ষের মতো ঠোঁটে সিগারেট ছুঁইয়ে অগ্নিসংযোগ করল। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার ছায়ায় বিষণ্ণ দৃষ্টি ছড়িয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠল,
——— “অমনটি করাই কি অপরিহার্য ছিল? হয়তো তবেই কাহিনির রূপান্তর ঘটত, অন্য সুরে বাঁধা থাকত এই পরিণতি।”
____________
শিকদার বাড়ি এক অমঙ্গলের ছায়ায় আবৃত, নিস্তব্ধতার বুকে শুধু শান্তর গগনবিদারী চিৎকার। আফ্রিদির সংবাদ এখনো পরিবারের কারো কর্ণগোচর করা হয়নি। রুদ্র আর মহুয়ার আগমন একমাত্র এই রহস্যের পর্দা উন্মোচন আর তদন্তের স্বার্থে। শান্ত যেন উন্মাদ, দুঃখে, ক্রোধে তার ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে গেছে। ড্রয়িং রুমের এক কোণে, ভীতসন্ত্রস্তভাবে হুইল চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে বৃদ্ধ শিকদার, যাঁর উপরই যেন সমস্ত ঘৃ'ণা বর্ষিত হচ্ছে। শান্ত খড়গের মতো চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
——— "এই বুড়ো ম'রার কথা ছিল তো! আমার বোন কেন ম'রলো? দাড়া, তোকেই মে'রে ফেলব আমি!"
তাকে যেন থামানোর কেউ নেই। চারিদিকে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি, কী এক প্রলয় অপেক্ষমাণ। উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে দেখছে; আজগর, কুদ্দুস আলী, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন সবাই; কেউ সাহস করে এগিয়ে আসে না। তবে ভয়ের আবহ, নাকি নীরব প্রার্থনা শান্তর প্রতিশোধের বাস্তবায়নে, তা বোঝা ভার!
যখন নিস্তব্ধ কাচের পাত্র ভাঙার শব্দে আঁখি যখন দেখল শান্ত ভাঙা কাচের বোতল হাতে নিয়ে দাদার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তার অন্তরের গভীর থেকে এক প্রবল আতঙ্ক তাকে ছুটে যেতে বাধ্য করল। শান্তর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
——— "কী করছো তুমি? এটা দাও, আমাকে দাও।"
——— "এইই হাত ছাড় আমার!"
তখনই আঁখির দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো আজগর আলী ও কুদ্দুস আলীর দিকে; যেন তারা পাথরে পরিণত হয়ে স্তব্ধ প্রহরীরূপে নীরব দাঁড়িয়ে আছে। ভাইয়ের মৃ'ত্যু কি তাদের সত্ত্বাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে নিজ পিতার র'ক্তপাতকেও তারা নির্বিকার চক্ষুতে উপেক্ষা করে? আলো মায়ের আঁচলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আড়াল নিয়েছে। নাঈম পাষাণের মতো নিশ্চল, আর আফিয়া বেগমও নিরুত্তাপ।
শান্ত হঠাৎ এক ধাক্কায় আঁখিকে ফ্লোরে আছড়ে ফেলল। ভারসাম্যহীনভাবে আছড়ে পড়ে রইল সে, যেন ভগ্নপ্রায় এক ভাস্কর্যের মতো!
ঠিক সেই মুহূর্তে এক দুর্বোধ্য কণ্ঠস্বর বেজে উঠল,
——— "এখানে কি চলছে?"
ধীরগতির পায়ে হেটে আসতে আসতে গম্ভীর ভঙ্গিমায় পকেটে হাত গুঁজে প্রশ্ন করল রুদ্র। পাশে মহুয়ার কঠোর মুখাবয়ব । শান্ত তাদের দেখামাত্রই ভাঙা কাচটি সশব্দে মাটিতে ফেলে, ক্রোধের বিস্ফোরণে নিজ কক্ষের দিকে চলে গেল।
আঁখি পেছন ফিরে তাকাল না; কে সেই আগন্তুক, জানতে চেষ্টাও করল না। সে ফ্লোরে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। রুদ্র তখন এগিয়ে গিয়ে, সেই এলোমেলো বসা মেয়েটির কাছে হাঁটু গেড়ে, নরম কণ্ঠে বলল,
——— "এভাবে বসে আছো কেন তুম..."
তবে বাক্যটি গলার গভীরে থমকে গেল। যখন আঁখি অশ্রুসিক্ত নয়নে পেছন ফিরে তাকাল, রুদ্রর বুকের অন্তরালের অতল গহ্বরে যেন এক অচেনা বিষাদের ঢেউ উঠল। এই চোখ—এই চোখ, বড্ড চেনা, যেন এক অজানা স্মৃতির প্রতিধ্বনি। স্মৃতির রাজ্যে, পরিচয়ের আড়ালে, রুদ্র ভাবছে—কে এই শ্যামকন্যা? কে? কিসের আহ্বান এই চোখের গভীরতায়? আশেপাশের কারো কোনো খেয়াল নেই! কিন্তু রুদ্র তাকিয়ে আছে; খুঁজছে এক অজ্ঞাত উত্তর, নিজেরই মনের অতল খুঁজে!
মহুয়ার ভ্রু সংকুচিত হলো। রুদ্র কি একটু বেশি সময় নিয়ে দেখছে? এই চোখে কী এমন আছে?মহুয়া অস্বস্তিতে দ্রুত রুদ্রর পাশে গিয়ে দাঁড়াল; তার অন্তরে অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে, অনুক্ত এক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে সে!
মুহূর্তে রুদ্র আচমকা এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটাল, যেন অন্য এক বাস্তবতার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে। অবলীলায় বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আঁখির চোখে স্পর্শ করে, মুছে দিল অশ্রুর ধারাকে; সে যেন এক অদ্ভুত মহিমায় অতন্দ্রিত। আঁখি নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, পলক ফেলতে ভুলে গিয়ে; সময়ের চক্রও যেন স্থির হয়ে গেল। সে কেবল রুদ্রের দিকে চেয়ে রইল, এক বিন্দুও নড়ল না—মুছে দিতে দিলো চোখের জল!
মহুয়া অবাক হয়ে রুদ্রর মুখাবয়বে নিবিষ্ট দৃষ্টি ফেলল, মনে মনে এক নতুন প্রশ্নের অঙ্কুরোদ্গম ঘটল। এ কেমন অপরূপ পরিবর্তন, হঠাৎ করে? অন্য সকলে এখন রুদ্রর দিকে সন্দিহান ছোট ছোট দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তবে সদর দরজার প্রান্তে দাঁড়িয়ে, ঘটনাপ্রবাহের কঠোর সাক্ষী হয়ে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে চোয়ালটি সঙ্কুচিত করে লালাভ দৃষ্টিতে মুগ্ধ দেখলো রুদ্রর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আঁখির অক্ষিকোটরের জল মুছে দেওয়ার নিদারুণ দৃশ্যখানা!
0 Comments