Ad Code

অসমাপ্ত অনুভূতি পর্ব - ৭

লেখিকাঃ সাবিহা জান্নাত

পর্বঃ ০৭

পরিচিত হাতের স্পর্শ পেতেই শ্রুতির মুখে হাঁসি ফুটে। চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিতেই ফিরে দেখে বিভোর এসেছে। বিভোরকে দেখেই শ্রুতি অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
বিভোর বিষয়টি আন্দাজ করতেই পেরেই তার মুখে কিঞ্চিত হাঁসি ফুটে ওঠে। প্রিয় মানুষের অভিমান টাও তার মনে আনন্দের ছোঁয়া লাগিয়ে দেয়।
প্রিয় মানুষ অভিমান করবে তার অপর প্রান্তের মানুষটি মনে একরাশ উৎসাহ নিয়ে সেই অভিমান ভাঙ্গাবে।
বিভোর অভিমানি শ্রুতির থুতুনিতে হাত রেখে মুখে মিষ্টি হাঁসি নিয়ে শ্রুতির উদ্দেশ্যে বলে উঠে,,,,
~ সরি । আমার ভুল হয়ে গেছে। আজ ভার্সিটিতে একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম তাই আসতে পারেনি । কিন্তু এখন তো এসেছি।
বিভোরের কথায় শ্রুতি জোরপূর্বক হাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে। বিভোর শ্রুতিকে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। আলতোভাবে শ্রুতির গলায় চেন পড়িয়ে দিতেই শ্রুতির অবাকের পরম পর্যায়ে পৌঁছায়।
~ এটা আপনি কই পেলেন।‌ মুখে একরাশ হাঁসি নিয়ে শ্রুতি বিভোর কে প্রশ্ন করে।
~ আমার তরফ থেকে আমার অপরুপার জন্য ছোট্ট উপহার বলেই বিভোর চেনটা শ্রুতির গলায় পড়িয়ে দেয়।
~ কিন্তু এর তো অনেক দাম হবে। এতো টাকা কই থেকে পেলেন আপনি ?
~ অনেক দিন ধরেই জমিয়েছিলাম।
শ্রুতির করা প্রশ্নে বিভোর হাসিমুখে উত্তর দেয়।
এটা আমার কাছে আপনার দেওয়া স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমি সারাজীবন এই স্মৃতি টা আগলে রাখবো, জানবো আপনি আমার সাথে সব সময় আছেন ( শ্রুতি )
✨
সোহানা আমি যদি কখনো না থাকি আমার মেয়েটাকে আমার মতো ভালোভাবে আগলে রাখতে পারবে তো ।
স্বামীর কথা শুনে সোহানা এক মুহুর্তের জন্য থমক যায়। সে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে উঠে,,,
~ হঠাৎ এমন কথা বলছো কেন? ( সোহানা )
~ এমনি ।আমি জানি না আমার অনুপস্থিতিতে আমার মেয়েটাকে কেউ আমার মতো করে আগলে রাখতে পারবে কি না ।আমার খুব ভয় হয় আমি সারাটা জীবন আমার মেয়েকে আগলে রাখতে পারবো কি না। সবাই ছেড়ে গেলেও তুমি কখনো যেন আমার মেয়েকে একা ছেড়ো না । আমি আমার মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারবো না ( সাদাদ চৌধুরী )
~ তুমি এসব কথা বাদ দাও তো। কিছুই হবে না ।ও সারাজীবন রাজকন্যা হয়েই থাকবে । তুমি এখন এসব চিন্তা না করে শুয়ে পড়ো ( সোহানা )
আর কথা না বাড়িয়ে তারা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে ।
সকালের নাস্তা করে সাদাদ চৌধুরী সবেমাত্র বেরিয়েছেন অফিসের উদ্দেশ্যে। পেছনে থেকে মেয়ের ডাক কর্নগোচর হতেই দাঁড়িয়ে যান । পেছনে তাকিয়ে দেখেন শ্রুতি মুগ্ধ করা হাঁসি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
তিনি মেয়ে কে দেখেই হাসিমুখে বলে উঠে,,
~ কি হয়েছে মামুনি।
~ বাবা আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবে। আজ বিকালে ঘুরতে যাবো তোমার সাথে। আর রাতে সবাই মিলে বাহিরে ডিনার করবো । তুমি আসবে তো ( শ্রুতি )
~ ঠিক আছে মামুনি ( সাদাদ চৌধুরী )
~ আমি কিন্তু অপেক্ষা করবো তোমার জন্য ( শ্রুতি )
সাদাদ চৌধুরী মেয়ের থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। শ্রুতি তার বাবাকে বিদায় দিয়ে নিজের ঘরে যায়।
~ এসব আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বালা করে আমার। মেয়ে হয়েছে না তো মোমের পুতুল হয়েছে। মেয়ে যা বলতে হবে তাই করতে হবে।মেয়ের জন্য তিনি বাড়ি বানালেন আলাদাভাবে।আবার মেয়েটা কোনো কিছু বলতে দেরী দিতে দেরী নেই।
তোমার ছোট ভাইয়ের এসব আদিখ্যেতা, দেখো এই অতিরিক্ত আদর তোমার ভাইয়ের কাল হয়ে দাঁড়াবে....
বিভোরের আম্মুর কথাটা সারাফ চৌধুরীর ( বিভোরের বাবা ) কর্নগোচর হতেই তিনি বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,,,
~ আহ্ থাক না এসব কথা । বাবা তো মেয়েকেই আদর করবে আমার ছোট ভাইও তাই করছে এতে আদিখ্যেতার কি হলো।
আর কাল হবে এসব কি কথা বলছো , আমাদের মেয়ে দুটোকেও তো আমরা কম ভালোবাসি না। তুমি আর এসব নিয়ে কথা বাড়িয়ো না ।আমি অফিস যাচ্ছি।
বলেই সারাফ চৌধুরী অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তাদের কথাগুলো শ্রুতির কানে কর্নগোচর হয় না।
শ্রুতি ওর ছোট ভাই সিফান কে সাথে নিয়ে দুই ভাইবোন কলেজ আর স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
সিফাত সবেমাত্র ক্লাস সেভেনে পড়ে আর শ্রুতি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। শ্রুতি সিফান কে স্কুলে রেখে কলেজের উদ্দেশ্যে চলে যায়।
কলেজ থেকে ফিরতে শ্রুতির দুপুর গড়িয়ে পড়ে। কলেজ থেকে ফিরে এসে ও ফ্রেশ হয়ে নেয়। দুপুরের খাবার খেয়ে শ্রুতি নিজের ঘরেই বিশ্রাম করে।
বিকালের দিকে বিভোরের সাথে ছাদে বসে সময় কাটাচ্ছে।আজ বাহিরে যাবে বিধায় সে বিভোর কে ভার্সিটি থেকে আগেই ফিরতে বলেছে।বিভোর ও সেটাই করেছে।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব। অনেকক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করার পরও তার বাবার দেখা নেই। অনেক বার কল করার পর ও তার বাবা ফোন উঠায় নি।
শ্রুতি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। সাধারণত তার বাবা কখনো তার কল উপেক্ষা করবে না। শ্রুতি এবং সিফান তার বাবার জন্য অপেক্ষারত।
হঠাৎ ই শ্রুতির আম্মুর কান্নারত কন্ঠ শুনে বিভোর , শ্রুতি এবং সিফান ছাদ থেকে নিচে নেমে আসে। এসেই ওরা বিচলিত হয় যায়। সবার চোখেই পানি।
কিছু মুহুর্ত আগে সোহানার ফোনে একটা কল আসে।কলটা রিসিভ করে অপরপ্রান্ত থেকে বিভোরের বাবা এবং মেজ চাচ্চুর কথা শুনেই বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে।
অনেক জিজ্ঞাসা করার পর ও শ্রুতি কারো থেকে কোনো জবাব পায় না। শ্রুতি, বিভোর ও সিফান তিন জনের মনেই প্রশ্ন কেন কান্না করছে এভাবে তারা । তাদের মুখেও চিন্তার ছাপ।
হঠাৎ বাসায় এ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ শুনেই শ্রুতি, বিভোর এবং বাকী সবাই থমকে যায়। পরক্ষনেই কয়েকজন ব্যাক্তি সাদা কাপড়ে ঢেকে কাউকে নিয়ে এসে তাদের মেঝেতে রেখে দেয়। পিছনে পিছনে বিভোরের আব্বু এবং মেজ চাচ্চু ও আসছে ।
শ্রুতির দৃশ্যটা নজরে আসতেই চোখ বেয়ে জল টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে। শ্রুতি গুটিগুটি পায়ে লাশের কাছে গিয়ে মুখ থেকে কাপড় টা সরাতেই নিজের বাবা চেহারা টা দেখা মাত্রই নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
উপস্থিত সবাই থমকে যায় শ্রুতির বাবার লাশটা দেখে। শ্রুতি তার বাবার মাথার কাছে অস্ফুট সে কান্না শুরু কান্না শুরু করে। তার এবং বাকী সবার আর্তনাদ বেড়েই চলেছে।
শ্রুতি ভিষনভাবে ভেঙ্গে পড়ে বাবার মৃত্যুতে। তার কাছে সবটা মেনে নিতেই কষ্ট হচ্ছে।একটা সময় পর সে সেন্সলেস হয়ে সেখানেই পড়ে যেতেই বিভোর শ্রুতিকে আগলে নেয়।
অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রাকের সাথে সংঘর্ষে পতিত হয় সাদাদ চৌধুরী। এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
কিছুসময় পর শ্রুতির জ্ঞান ফিরে মৃত বাবার চেহারাটা দেখেই সে বাবা বলে চিৎকার দিয়ে উঠে.......
শ্রুতির ঘুমের মাঝে আচমকা এমন চিৎকারে ওর আম্মু এবং ভাই দুজনেই তার ঘরে যায়। শ্রুতি আশেপাশে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিতেই বুঝতে পারে সে আবার ও সেই ভয়ংকর দৃশ্য টা স্বপ্ন দেখছে। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম।
শ্রুতির এমন আচরণে ওর আম্মু সবটা বুঝতে পারে। শ্রুতি তার বাবার জন্যই কান্না করছে। শ্রুতির আম্মু নিজের চোখের পানি আড়াল করে পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রুতির উদ্দেশ্যে বলে উঠে,,,
~ ভয় পেয়ে আছো কেন তুমি । কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছো ?
~ কি হয়েছে আপু তোমার । তুমি ঘুমের মাঝে চিৎকার করছো আবার কান্না করছো কেন? কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছো - সিফান কথাটা বলতে বলতে শ্রুতির পাশে গিয়ে বসতেই শ্রুতি আচমকা সিফান কে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয়।
তার চোখের পানি ঝরছে অবিরাম। শ্রুতির চোখের পানিতে সিফানের শার্ট ভিজে গেছে। সিফান নিজের আপুকে দুই হাতে আগলে নেয়।
সে তার আপুকে এর আগেও অনেকবার এমন আচরণ করতে দেখেছে। সে মূলত তার বাবার জন্যেই কষ্ট পাচ্ছে। সিফান ও কান্না করে তার বাবার জন্য কিন্তু প্রকাশ করে না।
কিন্তু তার আপুতো খুব ই নরম মনের মানুষ। তার মনটা এখনো খুব কোমল। বাবার অসময়ে আপুকে রেখে চলে যাওয়ার ধকল আপু এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
পুরোনো স্মৃতি গুলো এখনো তাকে বড্ড তাড়া করে বেড়ায়। সে চাইলেও অতীতের স্মৃতি গুলো মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি ।পারেনি মস্তিস্ক থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সেই ভয়ংকর দিনটাকে। যেটা তার আপুসহ তার পুরো পরিবার কে নিঃস্ব করে দিয়েছিল।
কেড়ে নিয়েছিল জীবন থেকে সমস্ত আনন্দ, সুখ, শান্তি। তাদের বেঁচে থাকা কে দ্বায় করিয়ে রেখেছিল ।কেড়ে নিয়েছিল বাবা নামক মাথার উপর ছাদ কে। তারা চাইলেও সে মুহুর্তকে ভুলতে পারবে না।
সোহানা ছেলে মেয়ে কে সামলে নেয়। সে কখনো নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করে না। নিজে ভেঙ্গে পড়লে সন্তান গুলো কে কেই বা সামলাবে ।সেই জন্যই তার এতো প্রচেষ্টা।
সিফান এবং ওর আম্মু চলে যেতেই শ্রুতি ফ্রেশ হয়ে নেয়। শ্রুতি কয়েকটা দিন ঘরে বসেই একাকিত্বে কাটিয়ে দেয়। বাবার শুন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে ফেলছে। সে চারিদিকে সব কিছু ঝাঁপসা দেখছে।
এই কয়েকদিনে সে কলেজ যায়নি, বাসা থেকে বেড়োয়নি, কারো সাথে ঠিকমতো কথাও বলেনি। বিভোর অনেক বার তার সাথে দেখা করার জন্য এসেছিল। একটিবার তার সাথে কথা বলার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছিল কিন্তু শ্রুতির শূন্য হৃদয়ের হাহাকার কেউ নিভিয়ে দিতে পারে নি।
মন টানেনি তার বিভোরের সাথে কথা বলার জন্য। বাবার শূন্যতার পাশাপাশি সে প্রিয়জনের শূন্যতা ও অনুভব করেছিল কিন্তু সে তবুও বিভোরের প্রতি তার মায়া উদয় করতে পারছে না। সে তার কথায় অটল।
একদিন সকাল বেলা বিভোর সবার সাথে বসে নাস্তা করছে। হঠাৎ বাবার কথা কর্নগোচর হতেই সে মাথা তুলে তাকায়।
~ সবই তো হলো। এবার একটা বিয়ে করে সংসারী হও। বয়স তোমার যথেষ্ট হয়েছে ( সারাফ চৌধুরী )
~ আমি এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না বাবা। আমার কিছুদিন সময় লাগবে বাবা ( বিভোর )
~ সময় তোমার কাছে অনেক পড়ে থাকবে। আমাদের ও যথেষ্ট বয়স হয়েছে । তোমার বড় বোনের বিয়ে দিতে পেরেছি। এখন তোমার বিয়ে দিলেই আমরা কিছুটা চিন্তা মুক্ত থাকতে চাই। তারপর তোমার ছোট বোনের বিয়ের দায়িত্ব তোমাদের হাতে থাকবে ( সারাফ চৌধুরী )
বিভোর বাবার কথায় কোনো রকম হা হুতাশ না করে নাস্তা শেষ হতেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। অফিসের কাজ সে করতে থাকে কিন্তু মনটা তার পড়ে রয়েছে অপরুপার কাছে।
আজ দুদিন পর বিকেলে বিভোর জোরপূর্বক ভাবে শ্রুতির সাথে কথা বলতে এসেছে । শ্রুতি ছাদে বসে সময় কাটাচ্ছে। বিভোরের আগমনে কিছুটা সে থমকায় তবুও নিস্তব্ধ সে।
বিভোর শ্রুতির পাশে গিয়ে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ শ্রুতির দিকে তাকিয়ে থেকে তার মন খারাপের কারন খুঁজতে লাগে। শ্রুতির দৃষ্টি স্থির আকাশের পানে।
বিভোর শ্রুতির হাতের উপর হাত রাখতেই। শ্রুতি চমকায়। পরক্ষনেই সে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু বিভোর খুব শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে। শ্রুতি বিভোরের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছাদ থেকে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
পরক্ষনেই বিভোর তার হাত ধরে টান দিতেই সে ছিটকে একদম বিভোরের কাছাকাছি চলে আসে। তাদের দু'জনের মধ্যকার দুরত্ব নেই বললেই চলে। বিভোরের এতোটা কাছাকাছি আসাতে শ্রুতির অস্বস্তি বোধ হচ্ছে।
শ্রুতি বিভোরের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে। বিভোর শ্রুতিকে দুই বাহুতে শক্ত করে আবদ্ধ করে রাখে।
~ শ্রুতি ! আই রিয়েলি লাভ ইউ। প্লিজ তুমি একবার আমাকে সুযোগ দাও। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। পরিবারের সবাইকে আমি রাজি করাবো। কিন্তু তুমি প্লিজ একবার রাজি হয়ে যাও।
বিভোরের অসহায় কন্ঠে শ্রুতির দৃষ্টি এখনো স্থীর। বিভোর অনেক বার হাত জোড় করানোর পর ও সে নিজেকে শ্রুতিকে রাজি করাতে পারে না।
শ্রুতিকে বিভোরের অনুভূতিহীন লাগছে।আগের সেই শ্রুতি আর সেই শ্রুতি নেই। না তার মাঝে সে কখনো আনন্দ দেখতে পায়, না কখনো খুশি। সব সময় সে মন মরা হয়েই দিন কাটায়।
প্রতিটি নিঃশ্বাসে তার দুঃখ গুলো প্রকাশ পায়। সবকিছু হারিয়ে সে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। হতাশার অন্ধকারে ডুবে গেছে তার প্রতিটিক্ষণ। সে এই তিন বছরে নিজেকে যতটা সামলে নিয়েছিল বিভোরের উপস্থিতি তাকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
~ যদি আরেকবার জন্ম নেওয়ার সুযোগ পেতাম , তাহলে তুমি যারে ভালোবাসো সেই মানুষটি হয়ে জন্ম নিতাম। যেন আমার এই জনমের ভালোবাসা অন্য জনমে সার্থক হয়।
কথাটা বলেই বিভোর শ্রুতিকে ছেড়ে দেয়। তাকে রেখে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
বিভোরের কথাটা শুনে শ্রুতি থমকায়। সে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।বিভোরকে কষ্ট দিয়ে সে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে সেটা সে নিজেও বুঝতে চাইছে না।
শ্রুতি সেখানেই বসে কান্না করতে থাকে। সে নিজের জীবন নিয়ে আর কিছু ভাবতে পারছে না।সে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার মনটা দোটানায় ভুগছে ।
রাতে শ্রুতি পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে। ওর মাঝে সে ড্রয়িংরুমে তার বড় আব্বু আম্মুর কথা শুনতে পায়। সে একটু এগিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের কথাগুলো শুনতে পায়।
তারা এসেছে আগামীকাল বিভোরের এনগেজমেন্টের কথা বলতে। তার খালাতো বোন ইরার সাথে আগামীকাল এনগেজমেন্টটা সাড়িয়ে ফেলতে চায়। শ্রুতি কথাটা শুনে চুপ ছিল কিন্তু তার বড় আব্বু আম্মু চলে যেতেই সে নিজের ঘরে দরজা আঁটকে বসে রয়।
বিভোরের অন্য জায়গায় বিয়ের কথা শুনে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অনেক কান্নাকাটির ফলে তার চোখগুলো লাল হয়ে গেছে বেশ। চোখগুলো ফোলা ফোলা । সে যে প্রচুর কান্না করেছে যে কেউ তার চেহারা দেখলেই বুঝতে পারবে ।
শ্রুতি আর কিছু না ভেবে রাতে শাওয়ার নিতে চলে যায় ওয়াশ রুমে। লম্বা একটা শাওয়ার নেয়।
~ ওনি সত্যি ই আমাকে ভালোবাসলে অন্য কাউকে কিভাবে বিয়ে করতে পারেন‌। সবই কি অভিনয় ছিল। নাকি নতুন করেও তাকে ভেঙ্গে ফেলতে চাইছেন। যেমনটা তিনি এর আগেও করেছিলেন।‌
এসব ভাবতে ভাবতে শ্রুতির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম।‌সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে শাওয়ার শেষ করে বেড়িয়ে পড়ে। তার রাতটা সে কোনো রকম পাড়ি দেয়।
সকাল থেকেই সবকিছুর আয়োজন শুরু হয়েছে । সন্ধ্যা বেলায় সারাফ চৌধুরীর একমাত্র ছেলের এনগেজমেন্ট। সব আত্মীয় স্বজন উপস্থিত হচ্ছে একে একে।
অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত মুহুর্ত টা এসেই যায়। বিভোর এবং ইরা একে অপরকে আংটি পড়িয়ে দেয়। সেখানে সবার সাথে শ্রুতির পরিবার ও উপস্থিত ছিল।
বিভোর অনেক অপেক্ষায় ছিল শুধুমাত্র শ্রুতির একটি বার হ্যা বলার অপেক্ষায় । কিন্তু বিভোরের দ্বিতীয় বার ভুলে সে তার দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন পড়েনি। মানুষ আমাদের জীবনে আসেই শুধু স্বার্থের জন্য। স্বার্থ শেষ হলেই সবাই চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক।
ঘটা করে তাদের এনগেজমেন্টটাও দ্রুত সেরে ফেলা হয়। বাকি দিন থেকেই বিয়ের সব আয়োজন শুরু হচ্ছে।
পরের দিন শ্রুতি কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল কিন্তু তার আসার নাম নেই বাসায়। সচরাচর সে দেরি করে না। তার আম্মু অনেক দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এই বিষয়টি নিয়ে তার বড় আব্বু কে বললে তিনি বলেন তিনি খোঁজ করছেন।
অনেক জায়গায় ফোন করে খোঁজ নেওয়ার পর ও তার খোঁজ পাওয়া যায় না। সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে আছে। শ্রুতির আম্মু এবং ভাই নিজেদের বাসায় চলে যায় বিভোরের বাসায় অনেকক্ষণ থেকে।
বিকাল বিভোরের বাসায় সবাই মিলে বিয়ের সব আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছে । এর মাঝে কলিংবেল বেজে উঠতেই বিভোরের আম্মু দরজা খুলে দিতেই দেখতে পান বিভোর এবং তার সব বন্ধুরা এসছে।
~ ভেতরে আসো । বিথী চৌধুরী তিনি হাসিমুখে কথাটা বলে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সায়নের কন্ঠে থেমে যান ।
~ আন্টি..!
বিভোরের আম্মু তাদের দিকে ফিরে তাকাতেই সায়ন সমানে থেকে সরে দাঁড়ায়। শ্রুতিকে বউ সেজে বিভোরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তিনি থমকে যান।‌ শ্রুতির দিকে তাকাতেই তার বুঝতে বাকী রইল না যে শ্রতি বিভোরের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ....!


Post a Comment

0 Comments

Close Menu