লেখিকাঃ সাদিয়া আকতার
সুপ্তি ঘরে যাওয়ার আগে আলভি আরেকবার বলে
: সুপ্তি!!!...
: হুম্মম..
: কথা দিয়েছিস....রাখবি তো??..
: হুম... গুড নাইট...
: গুড নাইট...
সুপ্তি নিজের ঘরে এসে বৈদ্যুতিক পাখা জোরে চালিয়ে দেয়। এক ঝটকায় মাথা থেকে ওড়না খুলে বিছানায় বসে বুক ভরে দম নেয়। সুপ্তি প্রচুর ঘেমে গেছে যদিও ছাদে যথেষ্ট বাতাস ছিলো। এখন কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে "আলভি ভাই কে দেখলে আমার এমন হচ্ছে কেন?.... এই অনুভূতি কি শুধু আমার একার??.... উনার প্রতিটা কথার অর্থ কেন আমার কাছে অন্য রকম লাগে???" কোন উত্তর খোজে পায় না সে। সুপ্তির চোখ যায় আলভি'র দেয়া উপহারের বক্সের ওপর। একটা ক্যান্ডেল তুলে নেয় দেখে তারিখ টা কানাডা যাওয়ার এক মাস পরের তাতে লেখা,
জানালার পর্দা সরিয়ে দেয় সুপ্তি অন্ধকার ঘরে চাদের আলো যেন এক টুকরো জ্বলন্ত প্রদিপ। সুপ্তি বিছানায় নিজেকে এলিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবে "আলভি ভাই!!!... সত্যিই আপনি আপনার কথা রেখেছেন!!... কিন্তু আমি কি.......আচ্ছা আলভি ভাই, শুভ্র নাম শুনে কেন কোন ভাব প্রকাশ করলেন না??..... তবে কি আমি আপনার মনে.... না... না... আমি এসব কি ভাবছি... উনি আমার বড় ভাইয়ের মতন.... এসব কথা উনি জানলে.... ছিহ!!... কি করবো আমি??.... আমারও যে অনেক কষ্ট হবে আপনি যদি......." সুপ্তির চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরে অশ্রু।
আলভি ওর রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে পানি টলমল করছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে " আম্মি!!! তুমিই তো বল সব কিছুর সময় আছে তাহলে আমার সাথে কেন অসময়ে....."
এই রাতে আলভির কথাই পূর্নতা পায়, তাদের দৃষ্টি ছিলো একই ঠিকানায় কিন্তু এরপরেও ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিলো স্রষ্টার হাতে।
-------------------------------
আজ সকালে সুপ্তিও রান্না ঘরে উপস্থিত। ভাইদের খাবার তৈরি করার দ্বায়িত্ব নিয়েছে যে। আলভি বরাবরই ডায়েট মেনে চলে তাই ওর জন্য ওটস সাথে কিছু ফল আর এক মগ কফি, আর সুপ্তের জন্য চর্বির তেলে ভাজা গরম পরোটা, ডিম পোচ, আলু ভাজি।
: উফফফ.... কাকিমনি!! সুপ্ত ভাইয়া এত জটিল খাবার কেন খায় বলতো??.... বলে সুপ্তি
: দেখেছিস.... তোকে তো বললাম আমি না হয়.. ভাবী বানিয়ে দিই... বলেন মিসেস ফারহাদ
: উম্মহ!!.... তা কি করে হয়... আমার এক মাসের ট্রেনিংয়ের আজকে ফাইনাল অডিশন.... তুমি বরং উৎসাহ দাও...
: হুম হুম সুন্দর হচ্ছে তো... তা বলি কি... বিয়ের পরে জামাই যদি এই বাঙ্গালিয়ানা খাবারই পছন্দ করে তখন কি করবি??... হ্যাঁ.... বলে হেসে দেন
: হেসো না তো.... আমিতো আগেই কথা বলে নিবো....
: তুই পারিসও বটে....
কিছু একটা ভেবে সুপ্তি বলে "আচ্ছা কাকিমনি!!!..... এরচেয়ে আমি বরং আলভি ভাই কে বিয়ে করে নিই.....
কথাটা বলার সাথে সাথে মিসেস ফারহাদ সুপ্তিকে মৃদু ধমক দিয়ে বলেন " খবরদার!! আমাকে বলেছিস ভাল.... আর কখনো এসব বলবিনা....."
: আমি কি এমন বললাম... উনি কি আমার নিজের ভাই যে.......ছলছল চোখে সুপ্তি বলে
: চুপ থাক.... নে নাস্তা তৈরি... সুপ্ত কে ডেকে আন।
রান্না ঘর থেকে বের হয়েই সোফায় আলভি কে ফাইলপত্র নিয়ে বসা দেখে সুপ্তি কিছুটা ঘাবড়ে যায়। জড়তা নিয়ে জানতে চায় " আ... আলভি ভাই.... আপনার কফি...."
: হুম্মম....
সুপ্তি মনে মনে বলে " উম্মহ কি ঢং!!.... হুম্ম্মম... কেন বলতে পারেনা হ্যাঁ কফি লাগবে... ধ্যাত!!..."
মুখ গোমরা করে কফি দিয়ে সুপ্তি চলে যায় সুপ্ত কে ডাকতে। আলভি এবার কিঞ্চিত হেসে ফাইল থেকে মুখ তুলে সুপ্তির দিকে তাকায়।
প্রাতভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরে আলভি কে দেখে মি. ফারহান জনতে চান " ফাইল সব গুলো কি দেখেছ?...."
: হ্যাঁ আংকেল!!.... আমার সাইনও করে দিয়েছি...
মি. ফারহান আলভি'র পাশে বসে বলে " এক্সিলেন্ট!! লিসেন মাই সান!!.. ফরগেট দ্যা পাস্ট থিংক অ্যাবাউট দ্যা ফিউচার!!... দেখো..তোমার বাবা'রও তো বয়স হয়েছে.... আমরা চাই তুমি আর সুপ্ত মিলে সব টা দেখ..... উই ওয়ান্ট টু রেস্ট..... হাহাহা....."
: এবসলিউটলি রাইট আংকেল!!!....
: সাব্বাশ!!..... কইগো সুপ্ত'র মা! খাবার রেডি কর.... আমি ফ্রেশ হয়ে টেবিলে আসছি....
: জ্বি... আসেন....তৈরি সব... রান্নাঘর থেকে বলেন মিসেস ফারহান।
সুপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে আলভি'র পাশে এসে বসে।
: কিরে সুপ্ত!!!.... কি অবস্থা?
: আর অবস্থা!!! ভালো.... বাবা তোকেও এসব দিয়েছে!!...
: কেন তোর ছুটি চাই নাকি... হাহাহা...
: উম্মমহ!! দোষ কি বল!!... আমি ভাবছিলাম কিছুদিন গ্রামে ঘুরতে যাবো... এখন তো মনে হচ্ছে সপ্তাহ খানেক আগে আর কিছু হবেনা...
: তুই খামোখা চাপ নিচ্ছিস!!... আমিতো আছি.. যা ঘুরে আয়!!
: এই সুপ্তি!!! দেখ তো আলভি'র মাথার নাটবল্টু কোথাও পরে গেছে কিনা....
: মানেহ!!.... স্মীত হেসে বাকা চোখে সুপ্ত'র দিকে তাকায় আলভি
: ভাই তুই ভাবলি কিভাবে!! আমি একা যাবো!!...
: আমি কি করবো যেয়ে.... গম্ভীর স্বরে বলে আলভি।
: ঘুরবো!!!... আড্ডা দিবো!!.... শুনলাম রাহাতও নাকি ফার্ম করেছে বছর দু'য়েকের মত....
রাহাত নাম শুনে আলভি একবার সুপ্তির দিকে তাকায় এরপর বলে " ফ্যামিলি ইস্যু তে আমার না থাকাই ভালো..."
: উফফ!! চুপ করতো... আমি বাবার সাথে কথা বলছি....
"এই যে বাবা'রা... তোমরা কি ওখানেই খাবে নাকি টেবিলে আসবে?" বলেন মিসেস ফারহান
: এখানেই দাও আম্মা!!... আমাদের কিছু গোপন ষড়যন্ত্র হচ্ছে তো...... হাহাহা....
: আমাকে ছেড়েই তোরা কি ঘুটুমুটু করছিস রে..... অনিতা পাশের সোফায় বসে বলে
: তুইও!!... ফাকিবাজ এখন ছুটি নিবে ঘুরতে যাবে.... বলে আলভি
: এই ভাইয়া এটা তো ভালো.... চল না যাই!!...
: আরেহ!! ফ্যাক্টরিতে ট্যুর দিতে হবে... প্রডাকশন চেক করতে হবে.... তুই যা না!!
: দেখেছিস অনিতা!!... তোর ভাই কে বোঝা!...
: ভাইয়া!! প্লিজ! চলনা! কতদিন পরে এসেছিস! একটু আমাকে সময় দে!!....
: আমি যাবো অনিতা আপি!!... কোথায় যাবা??.... সখ্য এসে বলে
: নো!! তোমার তো পরের মাসেই টেস্ট এক্সাম.... বলে আলভি
: আলভি ভাইয়া! তুমিও!!... অভিমান করে বলে সখ্য
: এই যে.... গল্প শেষ কর আর জলদি খাবার খেয়ে নাও..... টি টেবিলে খাবার সাজিয়ে বলে সুপ্তি।
: সুপ্তিইইই!! তুই বানিয়েছিস নাকি আপুনি!!.... অবাক হয়ে সুপ্ত জানতে চায়।
: হুম্মম্ম.... সবগুলোই... খেয়ে দেখ তো.. বলবা সবাই কেমন হয়েছে....
অনিতা, সখ্য, সুপ্তি, আলভি, সুপ্ত খাবার তুলে নেয়। আলভি ওটস'র বাটি তুলে নিতে সুপ্তি'র হৃদ কম্পন বৃদ্ধি পায়। অধীর আগ্রহে ওর কিশোরী অন্তর কিছু জানার অপেক্ষা করছে কিন্তু আলভি নিচে তাকিয়ে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে কোন কিছুই বলেনা।
: বাহ সুপ্তি!! মিক্সড ওটস দারুন বানিয়েছিস তো.... বলে অনিতা
: হুম্ম.... সংক্ষিপ্ত উত্তর সুপ্তি'র
: আরে একটু পরোটা নিয়ে
দেখ!!.... জাস্ট ইয়াম্মি!!... থ্যাংকস আপুনি!!!
: ওয়াও সুপ্তি আপি!!.... খুব মজা...
সুপ্তি কিছু না বলে শুধু একটু হাসি দেয়।
সুপ্তি'র চোখে পানি চলে আসে তাই হাত ধোয়ার বাহানা করে তড়িঘড়ি উঠে বেসিনের কাছে যায়। ঠোঁট চেপে কান্না আটকায় সুপ্তি অভিমানী মনে বলে " আলভি ভাইয়া!!.... কিছু তো বলতে পারতেন!!...."
খাবারের পর্ব শেষ হলে অনিতা ভার্সিটি'তে আর সখ্য স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। সুপ্ত'র কিছু কাজ ছিলো তাই সে ওদের কে গাড়িতে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
সুপ্তি আজকে কলেজ মিস দেয়। মনটা তার একদমই ভালো ছিলো না। বাড়ির পিছনের বা দিক টায় ঘাট বাধানো ছোট্ট একটা পুকুর ধারে এসে বসে। এই দিক টা সুপ্তি'র অনেক ভালো লাগে। প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা চারিদিকে আম, লিচু আরো কিছু ফলের বড় বড় গাছ, ডা'পার্শ্বে খানিকটা অংশ জুড়ে নানা ফুল গাছের বাগান করা। যখন ওরা ছোট ছিলো এখানে কত খেলা করেছে, আলভি'র কাছে সাতারও শিখেছে এই পুকুরে। স্মৃতিতে ছোট বেলার একটা দিনের কথা মনে পরে যায়,,,,,,
--------------------------------
: সুপ্তি আমাকে ধর!....
: সুপ্তি আমাকে! তোর ডানে আমি....
: আমাকে আমাকে সুপ্তি আমি তোর সামনে....
সুপ্তির চোখ বাধা, অনিতা সুপ্ত আলভি সবাই ওকে ঘিরে রেখেছে, কানামাছি খেলছে ওরা। সবার কথা শুনে অনুমান করে সুপ্তি এগিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ আলভি'র কন্ঠে চিৎকার " সুপ্তিইইইইইইই...... থাম..."
কথাটা শুনতেই পায়ে কি যেন বেধে হুড়মুড়িয়ে পড়ে কপালে অনেক জোরে ব্যাথা পায়।
এরপরে সব অন্ধকার....
মাথায় অনেক ব্যাথা করছে ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখে আলভি ওর ডান হাত ধরে পাশে বসে কান্না করছে। মা বাবা ভাই অনিতা সবাই ওকে ঘিরে রেখেছে সবার চোখে মুখে উৎকন্ঠা।
: ক.... কি... হয়েছে?... কোনমতে কথাটা বলে সুপ্তি।
ওর কন্ঠশুনে সবাই সজাগ দৃষ্টি নিয়ে তাকায়।
: মামনি!!.. খুব কষ্ট হচ্ছে!
: আপুনি!... ঠিক আছিস!
: মা!.... কেমন লাগছে এখন তোমার...
: মাথা ব্যাথা!!.....
কাঁদো স্বরে এবার আলভি বলে " এ... এখন ও একটু রেস্ট নিক.... পরে কথা বল...."
আলভি সেদিন এত কান্না করছিলো যে কথাও বলতে পারছিলো না ঠিকমতো।
সবাই আস্তে আস্তে চলে গেলেও হাত ধরে ঠায় বসেছিলো আলভি ওর পাশে।
ও যতদিন সুস্থ না হয়ে ওঠে ওকে খাওয়া ঘুম ওষুধ সব কিছুই আলভি দেখতো। মিসেস ফারহান এর জন্য একদিন আলভি'র মাথায় আদর করে বলেন "বাবা!!! তুমি সুপ্তির কত খেয়াল রাখো....
: পারিনি আন্টি!!.... তাহলে কি এভাবে ওর মাথা টা ইটের ওপর পরতে দিতাম!!.....
--------------------------------
সুপ্তি এসব ভেবে বাগানের ওই জায়গায় যেয়ে দাঁড়ায়। আলভি তখন ওর ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। হঠাৎ ওর দৃষ্টি জানালার বাইরে যেতে সুপ্তি কে দেখতে পায় পিছন থেকে। কিছু একটা ভেবে আলভিও ঘর ছেড়ে বাইরে আসে। সুপ্তি'র চোখে পানি মনে মনে বলছে " আলভি ভাইয়া!!.... তুমি জানো আমি কত কষ্ট পাচ্ছি!!.... পালটে তো আমি যাইনি.... তুমি পালটে গেছো!!.... মন চাইলো না সাত বছর কথাও বললে নাহ!!!.... কিভাবে পারলে!!!..... আমি আসলে কি করবো বলো.... আমার এই কষ্ট কি তোমাকে...... নাহ! এসব মিথ্যে... সব... আমিই শুধু এত কিছু ভেবে রেখেছি আমার মনে.... উনি আমাকে...."
: কি করিস?.....
আলভি'র কন্ঠ শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে হাসি মুখে ঘুরে দাঁড়ায় সুপ্তি। আলভি সুপ্তি'কে তীক্ষ্ণ চোখে দেখে বলে
: কান্না করছিস কেন?
: ক...কখন?....নাতো...
: হুম্মম্মমহ!! আমাকে অন্তত মিথ্যা বলতে আসিস না....
: আপনি হঠাৎ এখানে?
: কেন আসা যাবেনা?
: আমি কি এমন টা বললাম?
: তোকে দেখলাম তাই... ছোট বেলায় এখানে কত খেলছি...
: হুম্ম... আমি এর আগেও এখানে এসে ওইসব দিনের কথাই ভাবতাম...
: মিস করতি আমাকে?
: হ....ম...হ্য...হ্যাঁ.... সবাইকে...
: হাহাহাহা...
সুপ্তি আলভি'র অট্টহাসিতে মুগ্ধ হলেও লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়।
: কি হলো?
: কই.... কিছুনা... আপনিই বলেন কিছু শুনি...
: কি শুনবি??...
:..... .........
: বল?
: বলবেন তো?
: আগে বলতো শুনি...
: গান বলেন...
: মোটেও না....
: ক্যানো?
: এমনি.... আচ্ছা আজকে তোর কলেজ ছিলো না?
: হুম.... যাইনি...
: পড়াশোনা না করলে ভার্সিটিতে চান্স পাবি?
: করি তো... তবে আমার ভার্সিটি তে পড়ার ইচ্ছা কম...
: তাইলে আংকেল কে বলি বিয়ে দিয়ে দিক....
: নাহ!!!... বলে আঁতকে উঠল সুপ্তি
: কেন বিয়ে করবি না?
: ক....করবো...কিন্তু...
: কাকে?
: জানিনা.... সুপ্তির আবার অস্থিরতা বাড়ছে
: আচ্ছা বাদ দে.... চল ওখানে যেয়ে বসি...
দ'জনেই চুপচাপ পুকুর ঘাটে এসে বসে। কথা যে নাই তা নয় মনের মাঝে কথার ঝড় উঠেছে ঠিকি কিন্তু কিভাবে মুখ ফুটে বলবে সেটাই অজানা। তবে পাশাপাশি বসে আছে এতেই অন্তরের তৃপ্তি।
: আলভি ভাইয়া!...
: হুম....
: একটা কথা বলি?
: হুম...
: আ... আপনার কাউকে কি....
: আগে তোর টা বল.....
: কেউ নাই...
: সত্যিইই!!
: হুম...
: ভেবে বল...
: হুম... আছে...
স্মীত হেসে আলভি বলে " কে?.."
: আছে কেউ...
: শোন সুপ্তি!!.... তোর বয়স টা এখন আবেগের বুঝলি?....
: কিন্তু যাকে পছন্দ করি সে তো আবেগের বয়সে নাই...
: হাহাহা.... হয়ত.... কিন্তু একটা কথা সব সময় মনে রাখবি..... আবেগ কে যত বেশি কন্ট্রোল করতে পারবি এটা তোর জন্যই ভালো হবে....
: হুম... মেয়েদের হৃদয় কে পাথরের মত শক্ত রাখতে হয়...
: কে বলেছে?
: আপনিই তো তাই বললেন...
: উল্ট বুঝিস কেন বলতো..... ধুরু!!! বলে রাগ দেখিয়ে আলভি চলে যেতে চাইলে সুপ্তি বলে।
: তাহলে কার সাথে কথা বলবো..... আপনিই বলেন??
: কেন আমি কি মরে গেছি?
: কি বাজে কথা এগুলো??
: তো??.... তোর কথা বলার মানুষ পাচ্ছিস না তো!!!
: এত রাগ করেন কেন.... এতদিন তো মনেও পরেনি আমাকে...... বলে মুখ ফিরিয়ে নেয় সুপ্তি
আলভি চলে যাচ্ছিলো কিন্তু সুপ্তি'র কথা শুনে ফিরে এসে সুপ্তিকে দাঁড় করায়, দুই হাত ধরে ঝাকি দিয়ে বলে
: এই!!... তোকে বলিনি কারণ আছে জন্য এত দিন কথা বলিনি....
: সাত বছর আলভি ভাইয়া!!!... সাত বছর!!...
: তো? ফিরে তো এসেছি?
: ধন্যবাদ!!... অবজ্ঞা ভরে বলে সুপ্তি
: চিন্তা করিস না সুপ্তি!!.... কাজ শেষ হলে আবার চলে যাবো...
: মানে?..... ক.... কোথায়??.. কেন??
: সুপ্তি!! ছোট্ট এই জীবনে এমন কোন মায়ায় নিজেকে জড়াস না যেটা তে তোর কষ্ট হয়.... তুই ভালো করেই জানিস তোর কষ্ট আমার সহ্য করার ক্ষমতা নেই....
: কিন্তু আমি তো কষ্ট পাচ্ছি আলভি ভাইয়া!!
: কি নিয়ে বল??...
সুপ্তি কেমন যেন ঘোরে মধ্যে চলে গেছে আনমনে বলে "শুভ্র কি সত্যিই আমার কাছে একদিন অপরিচিত হয়ে যাবে!!!....."
আলভি থ হয়ে সুপ্তির দিকে তাকিয়ে আছে কোন জবাব নেই। সুপ্তি'র চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরছে দেখে আলভি সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়। সুপ্তি পাথরের মতো ওখানেই দাড়িয়ে থাকে একা।
আলভি ঘরে ফিরে দেখে সুপ্ত ফিরে এসেছে।
: এসেছিস.... সুপ্তির সাথে তোরে দেখলাম তাই....."
: তাই??...
: চলে এলাম তোর ঘরে....
: কেন ওখানেই যাইতি?
: তোদের পার্সোনাল আলাপে আমি গিয়ে করবো??
: তোর বোনের সাথে আমার কোন পার্সোনাল আলাপ নাই.... বিরক্তি নিয়ে বলে আলভি
: আবার ঝামেলা করছে নাকি সুপ্তি??...
: নাহ!!... কি ঝামেলা করবে... আবেগী বেশি....
: ভাই তুইই পারিস খালি ওরে সামলাইতে.... উফফ...
: তো আমাকে দিয়ে দে না সারাজীবন.... বাকা চোখে বলে আলভি
: কি যে বলিস ... আচ্ছা শোন আমি বাসার সবার জন্যই ড্রেস কিনছি.... নে এই মিন্ট কালারের শার্ট টা তোর....
: তোর জন্য নিস নি?..
: হুম... এইযে এটা... সেম কালার..
: থ্যাংকস.... ভালোই লাগবে দেখছি...
: হুম্ম... এটা পরে তোর শুভ্রা কে প্রপোজ করিস..... হাহাহাহা...
: শুভ্রা!!... পাবোনা রে... জীবনে কাছের সবাইকে হারানো আমার ভাগ্যের লিখন.....
: এভাবে কেন বলছিস??.... মন থেকে চাইলে ভাগ্যের লিখনও বদলানো যায়...
: হুম্ম.... তোর কি কোন আউট ডোর প্ল্যান আছে?
: হুম... ভাবছি নীলিমার বাসায়....
: সুপ্ত!!... এত দিন পরেও কি নীলিমা তোর জন্য অপেক্ষায় থাকবে...
: কেন থাকবে না.... ও তো আমাকে প্রমিস করেছে...
: সুপ্ত ভাই আমার... মেয়েদের ফ্যামিলি প্রেসার বেশি থাকে... বিশেষ করে বিয়ের ব্যাপারে মেয়েদের কে অধিকাংশ বাবা-মা'ই জোর করে....
: তো??
: নীলিমা'র সাথে যদি এমন হয়ে থাকে...
: না না... মানে ত..তুই কি বলিস... আরে নীলু'র সাথে আমার তো যোগাযোগ আছে....
: লাস্ট কবে?...
: এই একমাস আগে... ওর বাসায় চাপ ছিলো এটা জানি কিন্তু ব...বিয়ে... নাহ.... কি যে বলিস...
: অন্যের বউ'কে নিয়ে কথা বলা পাপ এটা তো জানিস??
: মানেহ!!
: হ্যাঁ... নীলু বিয়ে করেছে...
: আলভি!! প্লিজ মজা করিস না... থ... থাম... আ.... আমি নীলু কে কল দিই....
: সুপ্ত...সুপ্ত... ভাই আমার... নীলু আর তোর নাই... পাগলামি করিস না...
: আমি কাকে নিয়ে বাচবো আলভি????...... সুপ্ত'র গলা ধরে আসে
আলভি সুপ্ত'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর চোখেও পানি শান্তনা দিয়ে বলে " শ.... শোন ভাই... জীবনে এরকম কত কি হবে... নিজেকে ধরে রাখ... এমনো হতে পারে এরচেয়ে ভালো কোন মেয়ে তোর জীবনে আসবে....
: আ.... আমার নীলু কে এনে দে না ভাই.... আমার... আমার বিশ্বাস হচ্ছে না... আ... আমাদের এত এত স্মৃতি ক.... কিভাবে......আমাদের ভালোবাসা....
: ভালোবাসা??... ভালোবাসা মানে কি এই যে সারাদিন তার সাথে আলাপ হচ্ছে... ঘুরা হচ্ছে??... ভালোবাসা তো এক গভীর অনুভব... দেখা হবে না কথা হবেনা কিন্তু এরপরেও সে মানুষ টা কে ভুলে থাকা যাবে না... দুইটা প্রাণ অপেক্ষায় থাকবে মিলনের.... আর তুই কার জন্য দু:খ পাচ্ছিস ভাই??... নীলু একটা বার জানাতে পারতো না.... তুই কি জানবি আমার তো মনেহয় তোর বাড়ির লোকরা জানে কি না সন্দেহ.....
: আমি রুমে যাচ্ছি....
: নাহ!!... তুই এই রুমেই থাক আমি বরং অন্য ঘরে যাচ্ছি....
------------------
দুপুরে খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত থাকলেও সুপ্ত কিম্বা সুপ্তি কেউ ছিলো না।
মিসেস ফারহাদ বললেন "ওমা! এরা দুই ভাই বোন আবার কোথায় গেলো?"
: কাকিমনি... আমি দেখছি দুই জন কে.... আমাকে বরং একটা প্লেটে খাবার দাও....
আলভি খাবারের প্লেট হাতে প্রস্থান করলে সেই দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি রেখে মিসেস ফারহাদ বলেন "দেখেছো ভাবি!!..... আলভি কত ভালোবাসে ওদের....
: হ্যাঁ ছোট থেকেই আলভি ওদের নিজের বোনের মতই দেখে....
: ভাবী বলছি কি..... আলভি আমাদের সদস্য হয়ে যাক না...
: রুমানা!!! আজকে বলেছো ভালো আর কখনো এটা বলো না....
খাবারের প্লেট নিয়ে আলভি সুপ্তির দরজায় নক করে, কোন সাড়া পায় না। কিঞ্চিত ভ্রু কোচকে ধীরে দরজা খোলে জানালা দিয়ে দেখে সুপ্তি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আলভিও এগিয়ে যায় বেলকনির দরজায়। সুপ্তি মনেহয় শ্যাম্পু করেছে, বাতাসে চুলের ঘ্রাণ মিশে আছে। কোমর অবধি ঘন চুল এলোমেলো ভাবে উড়ছে। আলভি এমন সুপ্তিকে আজ প্রথম দেখলো। কিশোরী কালের রুপ যেন ফুটে আছে সর্বাঙ্গে। নিজের আবেগ কে নিয়ন্ত্রণ করে সরে আসে একটু জোর গলায় বলে " আমি কিন্তু রুমে এসেছি.....
আলভি'র কন্ঠস্বর শুনতেই মাথায় ওড়না টেনে ঘরে আসে সুপ্তি।
: আপনি?..
: হুম্ম... খাওয়ায় দিবি নাকি দিবো?..
: বুঝলাম না?
: তোকে এক কথা কয়বার বলা লাগে?
: খাওয়ায় দেন...
: তাইলে জলদি বসে পর ওই দিকে সুপ্ত যে আবার কি করছে...
: কেনো? ভাইয়ার কি হইছে?
: নীলুর শোকে পেয়েছে...
: উফফফ.... ওই ডাইনি মেয়েটা!!.... জানেন ও জাস্ট ভাইয়া কে ঘুরাই তো.... ওর তো রিলেশন ছিলো যাকে বিয়ে করছে ওর সাথে.....
: আমি অনেক আগেই এটা অনুমান করেছিলাম...
: তাইলে ভাইয়া কে সাবধান করেন নি কেনো?
: ওই যে আবেগের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি.....
: হুম্মম্ম....সরি আলভি ভাইয়া!!!
: মাইর খাবি?...
: আমি এরপর থেকে বুঝে শুনে কথা বলবো.....
: হুম্মম... ভালো... নে...
: না না চলেন.... ভাইয়ার কাছে যাই....
: তুই তাইলে আমার রুমে যা.... আমি অনিতা কে ডেকে আনছি....
আলভি'র ঘরে খাটে সুপ্ত,সুপ্তি, অনিতা সবাই বসে আছে আর ও সবাইকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে।
অনিতা মনে মনে খুশি ছিলো অনেক আজকে তার ভাই নিজ হাতে খাইয়ে দিবে বলে ডেকেছে।
সুপ্তি একটু ইতস্তত করেই খাবার নিচ্ছিলো দেখে আলভি ধমকে ওঠে " এই তোর কি সমস্যা রে!!!... বড় হা কর... এত টুকু ভাত চাবাইতে কতখন লাগে...."
: আস্তে আলভি!! আমিই ভয় পেয়ে গেছি...... হাহাহা.... সুপ্ত'র সাথে সবাই হেসে দেয়।
খাওয়া শেষে আলভি বলে
: শোন বাচ্চারা... লাঞ্চ শেষ... আড্ডাও হলো.... এখন সবাই রুমে যেয়ে রেস্ট নিবে কেমন?...
: তুই কোথাও যাবি নাকি??.... বলে সুপ্ত
: হ্যাঁ.... সন্ধ্যা সাত'টায় একটা মিটিং আছে.... এই জাস্ট ইনট্রোডিউস হবে আর কিছু ফরমাল লিডিং.....
: হুম্ম....আমিও তাইলে বের হই...
: তুই রেস্ট নে না...
: এমন কিছু হয়নি যে রেস্ট নিতে হবে.... তুই না বললি কার জন্য হুদাই কষ্ট পাচ্ছি??....
: হুম্ম... এই তো.... ওকে চল যাই...
--------------------
আফতাব আরুশা কোং লিমিটেড
আলভি কোম্পানির সাইনবোর্ডে একমনে তাকিয়ে আছে দেখে সুপ্ত বলে " চল..."
: নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজই ভালো হয় না.... দেখনা আমার পা চলছে না আর....
: আলভি!!! বাবা তুমি এসেছো!!.... হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন মি. আফতাব
: নিরুপায়!!... তাই আসতেই হলো.... আলভি'র এমন উত্তরে সুপ্ত চোখ পাকায় তাকায় আলভির দিকে।
: কেন এমন বলছো বাবা!!...
: দেখুন!!...আপনার আর আমার মাঝে হয়ত কোনদিন কিছু স্বাভাবিক হবে না... আমরা বরং কাজের কথায় আসি....
: আহ!! আচ্ছা শুনো.... ফায়সাল এগ্রোর সাথে আমাদের দশ বছরের ডিল হবে.... তোমাকেই এটা করতে... এই জন্যই এতদিন স্থগিত ছিলো....
: আচ্ছা!!....আমাকে ওই কোম্পানির ফাইল পত্র দেখতে হবে....
: হ্যাঁ... চলো.... সুপ্ত আসো বাবা... ফারহান ভিতরেই আছে....
--------------------
আলভি একটা কাচে ঘেরা অফিস রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নেম প্লেটে লেখা "আরুশা হক"................
0 Comments