লেখিকাঃ সাবিহা জান্নাত
বিভোর বাসায় ফিরে এসেছে। মায়ের মুখে কথাটা শুনেই থমকে যায় শ্রুতি। মায়ের কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে স্থীর হয়ে পড়ার টেবিলে বসে রয়েছে শ্রুতি। চুপচাপ সে মায়ের কথা শুনে যাচ্ছে।
~ তোমার বড় আব্বু যেতে বলেছে তোমাদের কে। তোমরা ভাই বোন চলে যেও রাতে।
~ওই বাসায় যাবো না আমি।মায়ের কথার পৃষ্ঠে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দেয় শ্রুতি।
~ তোমার বড় আব্বু অনেক বার অনুরোধ করেছে আমাকে। আমি তার কথা ফেলতে পারি নি। তাই ভালো হয় যদি তোমরা দুই ভাইবোন তাদের বাসায় যাও।
মায়ের নরম সুরে বলা কথাতেও মন গলে না প্রতিজ্ঞাবদ্ধ শ্রুতির। সে ঠাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে থাকে তার কথায়।
~ আমার তাদের কথা একদম সহ্য হয়না আম্মু। বড় আব্বু আর দিদুন তো কিছু বলে না কিন্তু বাকী মানুষগুলো। তারা তো আমাদের কে মানুষই ভাবে না। তাদের চোখে আমরা কলঙ্কিনী আর তারা ফেরেশতা। তাদের কথায় তুমি কিছু মনে না করলেও আমার অনেক কিছুই এসে যায়। আমি যাবো না ব্যস।
শ্রুতির আম্মু হাল ছেড়ে দেয়। মেয়েকে বললে সে বুঝবে না। আর যেহেতু সে যাবে না তাহলে ছোটটিও ( শ্রুতির ছোট ভাই ) যাবে না। সে তো তার বোনের কথায় অটল। তার বোন যেটা বলবে সেটাই হবে। পৃথিবী উল্টে গেলেও সে তার বোনের বিরুদ্ধে যাবে না। দুইজন এক সু্ত্রে গাঁথা।
তোমাদের যা ভালো মনে হয় তাই করো , আমি বলার কে - কথাটা বলেই শ্রুতির আম্মু সোহানা ইসলাম তার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। শ্রুতির আম্মু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই তড়িঘড়ি পায়ে ঘরে প্রবেশ করে সিফান।
~ কি হয়েছে আপু । রেগে আছো যে, আম্মু কি কিছু বলেছে তোমাকে। সিফান আপুর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ব্যস্ত কন্ঠে প্রশ্ন টা শ্রুতির দিকে ছুড়ে দিতেই শ্রুতি রাগান্বিত হয়ে বলে উঠে,,,
~ বড় আব্বু যেতে বলেছে। আজ কোনো বিশেষ আয়োজন আছে । সবাই এসেছে তোকেও যেতে বলেছে, যাবি তুই?
কথাটা বলেই শ্রুতি রাগান্বিত চেহারা নিয়ে সিফানের তাকাতেই সিফানের বুঝতে বাকী রইল না যে, তার আপু রেগে কথাটা বলেছে। সে যদি ভুল করেও আপুর মতের বিরুদ্ধে কিছু বলে তাহলে আজই তার শেষ দিন ।সিফান মুখে জোরপূর্বক হাঁসি দিয়ে তার আপুকে বুঝিয়ে দিতে থাকে যে সে তার মতের পক্ষে।
~ কি যে বলো না আপু। আমি যাবো তবুও আবার ওই বাসায়। আজ সব ডাইনিগুলো এসেছে হয়তো। ডাইনিগুলো আমার বোনের সৌন্দর্যের কাছে তুচ্ছ। তাই আমি চাই না সেখানে আমার আপু কে নিয়ে গিয়ে ছোট করতে । তুমি রিল্যাক্সে থাকো আমি ওখানে যাচ্ছি না।
সিফান এটা ওটা বলে তার বোন কে ভুলিয়ে দিতে চাইছে। যদি তার আপু কখনো বুঝতে পারে সে ওই বাসায় যাওয়ার জন্য আগ্রহী তাহলে চোখের সামনে যেটা পড়বে সেটা নিয়েই তেড়ে আসবে মারার জন্য।
~ তোকে এতো কথা বলতে বলিনি । তুই ভালো করেই জানিস আমার কোন কাজগুলো পছন্দ এবং কোন কাজগুলো অপছন্দ। সেই ভেবেই কাজ করবি। যা এখন বের হো আমার ঘর থেকে।
সিফান শ্রুতির কথায় হ্যা সম্মতি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার খুব ইচ্ছে করছে বড় আব্বুদের বাসায় যেতে। তিনবছর পর বিভোর ভাইয়া বাসায় এসেছে । পড়াশোনার জন্য এই শহর ছেড়েছিল। তবে সে এই তিন বছরে একবার ও এই শহরে পা রাখেনি। কে জানে কেন এই শহরটা ছেড়েছিল । আর কেনই বা ফিরে এসেছে। বিভোর ভাইয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে সিফানের মনটা ছটফট করছে কিন্তু তার আপু জানতে পারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
বিভোর ভাইয়ার নামটা শুনলেই শ্রুতির মাথায় র-ক্ত উঠে যায়। কখনো সে মন মরা হয়ে থাকে আবার কখনো প্রচন্ড ঘৃনা করে বিভোর নামটাকে। কি আছে এর পেছনের কারন , কেনই বা আপু বিভোর ভাইয়াকে এতোটা ঘৃনা করে।
সে যদি লুকিয়ে বিভোর ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যায় তাহলে কোনো না কোনো ভাবে খবর টি আপুর কানে যাবে । তখন আমার ভাবার জন্য হয়তো এই মনটা থাকবে কিন্তু চলার জন্য হয়তো পা থাকবে না। ঠ্যাং কেটে তখন আপু আমাকে ঘরে রেখে দিবে কথাটা ভাবেই সিফানের সারা শরীর শিউরে উঠে।
না বলে এভাবে হুটহাট বাসায় ফিরে এসেছো কেন। আমাকে একটি বারের জন্য ও জানাওনি কেন। তুমি যেভাবে এসেছো দুইদিন থেকে সেভাবেই আবার ফিরে যাবে। আমি চাই না তুমি এই শহরে ফিরে আসো।
মায়ের কথায় তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠে বিভোর। মুখে তার তাচ্ছিল্যের হাঁসি,,
~ আমার আসাতে তুমি খুশি হওনি। তিন বছর পর নিজের বাসায় ফিরলাম কোথাই একটু আদর যত্ন করবে সেটা না করে আবার চলে যেতে বলছো। আমি চলে যাওয়ার জন্য আসিনি । এখানে থেকে যাওয়ার জন্য ই এসেছি। কোথাও যাচ্ছি না আমি , ওকে।
ছেলের কোথায় বিভোর এর আম্মু প্রচন্ড রেগে যান । লোক ভর্তি মানুষের মধ্যে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করে রাখেন তিনি। দিন দিন তার ছেলেটা অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। যেটা খুশি সেটাই করবে সে , তার সাথে কথা বলার মতো কোনো পরিস্থিতিতে সে নেই।
বিভোরের খালাতো বোন ইরা বিভোর কে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরতে নেয়,,
~ একদম গাঁয়ে পড়বে না আমার। এসব অসভ্য চালচলন আমার মোটেও পছন্দ নয়।
বিভোর মেয়েটার সাথে অন্তত ভালো ব্যবহার করো। দেখলে তো মেয়েটা কেঁদে দিয়েছে তোমার ব্যবহারে । মায়ের কথাটা কানে আসতেই বিভোরের রাগে কান দিয়ে ধোঁয়া বেড়োনের উপক্রম।
~ এসব নোংরা টিকস্ খেলা বন্ধ করো। তোমাদের খুব ভালো করেই জানি আমি। এটলিষ্ট আমার কাছে এসব ড্রামা দেখানোর চেষ্টা করো না।
~ বিভোর ...!
~আমি রুমে যাচ্ছি। আমাকে মোটেও বিরক্ত করার চেষ্টা করবে না।
বিভোর তার মায়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়িয়ে চলে যায়।
বিভোরের আম্মু বীথি চোধুরী ছেলের ব্যবহারে রীতিমত অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। ভেবেছিলাম এই শহর থেকে দূরে রাখলে বিভোর হয়তো সুধরে যাবে । কিন্তু সে তো সুধরে গিয়ে আমার মুখের উপর কথা বলছে।
আগে অন্তত আমার সামনে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস পেত না। অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সেই গর্তে নিজেই পড়ে যাচ্ছি আমি। এসব নানা চিন্তা করে রাগান্বিত হয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই। তাদের যৌথ পরিবারে দিদুন, বাবা মা, ছোট বোন , তার মেজো কাকা, কাকি, তাদের সন্তান। তার ফুপী, ফুফাতো বোন এবং খালা মুনি এবং খালাতো বোন বেড়াতে এসেছে তার বাসায় ফিরে আসার কথা শুনেই।
~ ছেলেমেয়ে দুটো আসলো না তো। খাবার টেবিলে বসে বিভোরের দিদুন তার বাবার উদ্দেশ্যে কথা টা বলতেই তার ফুপী তানিয়া চৌধুরী বিরক্তি কন্ঠে বলে উঠে,,
~ ওই সর্বনাশী মেয়েটা আসবে মানে। মা তুমি এখনো ওদের কথা ভাবছো যাদের জন্য ছোট ভাইয়া.... বিভোরের ফুপী কথাটা বলে শেষ করতে পারে না, তার পূর্বেই দিদুন রাগান্বিত হয়ে বলে উঠে,,,
~ সাবধানে কথা বলো তানিয়া। মেয়ে হয়ে জন্মানো টা কি পাপ? সেদিন যেটা ঘটেছিল সেটা সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা। বাবার মৃত্যুর জন্য কি তার মেয়ে দায়ী। কোনো মেয়ে কি তার বাবার মৃত্যু কামনা করতে পারে। শ্রুতি যদি তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী হয় তাহলে তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য তো তুমি দায়ী।
~ কিন্তু মা , সেদিন ছোট ভাইয়া যদি...( তানিয়া চৌধুরী )
~ চুপ করো তুমি। একটা মেয়ে হয়ে অন্য একটা মেয়েকে কটু কথা বলতে লজ্জা করে না তোমার । নিজের সীমার মধ্যে থাকো তুমি। তার বাবা নেই বলে যা খুশি তাই বলতে পারো না। ওরা কিন্তু আমার ও র- ক্ত। আমার নাতি নাতনি ওগুলো। তোমরা দূরে সরিয়ে দিলেও আমি কখনোই পারবো না তাদের দূরে সরিয়ে দিতে।
~ মা তুমি একটু শান্ত হও। তোমার বিপি বেড়ে যাবে। আর সবাই চুপ করো। এই বিষয়ে যেন আর কাউকে কোনো কথা বলতে না শুনি। ওরা আমাদের ছেলেমেয়ের মতো।
মা আমি সোহানা কে বলেছিলাম ওদের কে আসার জন্য কিন্তু কেন যে আসেনি। আমি কাল গিয়ে জিজ্ঞেস করবো। তুমি শান্ত হও । বিভোরের বাবার কথায় তার দিদুন শান্ত হয়ে যায়।
সবাই সবকিছু দেখছিল। তবুও কোনো কথা না বলে চুপচাপ ছিল । বিভোর শ্রুতির নামটা শুনেই থমকে যায়।পরিচিত মানুষ টাকে কতই না অচেনা লাগছে তার।
[ শ্রুতি বিভোরের ছোট কাকার মেয়ে। তিনবছর আগে শ্রুতির বাবা মারা যাওয়ার পর তানিয়া চৌধুরী আর বিথী চৌধুরীর ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে শ্রুতির আম্মু সন্তানদের নিয়ে আলাদা বাসায় থাকতে বাধ্য হয়েছিল ]
উপস্থিত সবাই চুপ হয়ে যায়। কারো মুখে কোনো কথা নেই। খাবার শেষ করে সবাই নিজেদের রুমে চলে যায়।
~ ছোট ভাবী আর ছোট ছোট ছেলে মেয়ের সাথে তাদের কিসের শত্রুতা তোমার বোন আর বড় ভাবীর। তাদের সহ্য করতে সমস্যা কোথায়। ওরা কি তোমার বোন আর ভাবীর জায়গা জমির থাকতো। ওরা তো ওদের বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার। ওদের এই বাসায় থাকার অধিকার আছে। তবুও তাদের সাথে এই ব্যবহার আমার মোটেও ভালো লাগে না।
বিভোরের তিথি চোধুরী (মেজ কাকী) ঘর গোছাতে গোছাতে কথাটা বলে উঠে তার স্বাবী সাদাত চৌধুরী কে। সাদাত চৌধুরী শুধু শুনে যাচ্ছে কিছু ই বলছে না। এটা রোজকারের কথা, তাই সে আর কিছু জবাব দেয়নি নতুন করে।
~ জানো ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখলে আমার বড্ড মায়া হয়। ছোট ভাবী একাই কত কষ্ট করে বাবাহীন তাদের কে আগলে রেখেছে। তোমাদের ও তো দায়িত্ব আছে তাদের প্রতি।
হ্যা সেটা তো বটেই।বড় ভাই আর আমি সব সময় তাদের জন্য চেষ্টা করি কিছু না কিছু করার জন্য। অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমিয়ে পড় ( সাদাত চৌধুরী )
রাত গভীর হয়েছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। খোলা আকাশের নীচে বসে আছে বিভোর। সে নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে চারিপাশে পায়চারি করে নিজের রুমে গিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
0 Comments